
পাটক্ষেত অক্ষত, তবু মামলা’—হয়রানির অভিযোগে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী, তদন্তের নির্দেশ আদালতের
নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের ঘিরনই মালতোলা গ্রামে পাটক্ষেত নষ্ট, মারধর, শ্লীলতাহানি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং উপজেলা জিয়া মঞ্চের আহ্বায়কসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। মামলার বাদী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মজিদ অভিযোগ করেছেন, সংঘবদ্ধভাবে তার জমিতে প্রবেশ করে পাটক্ষেত নষ্ট করা হয়েছে এবং বাধা দিতে গেলে তার স্ত্রীকে শ্লীলতাহানির শিকার হতে হয়েছে। তবে মামলার আসামি ও স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। স্থানীয়দের একাংশ মামলাটিকে ‘হয়রানিমূলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে বাদীপক্ষ বলছে, তাদের জমি ও পরিবারের ওপর হামলার বিচার চাইতেই তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
আদালতে মামলা, গুরুতর অভিযোগ
আদালত সূত্রে জানা যায়, ঘিরনই মালতোলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মজিদ গত ১০ জুন রংপুরের বদরগঞ্জ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে একটি নালিশী মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, গত ৮ জুন বিকেল ৩টার দিকে উপজেলার জিয়া মঞ্চের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেনের নেতৃত্বে সাতজন তার মালিকানাধীন জমিতে প্রবেশ করে পাটক্ষেত নষ্ট করার চেষ্টা করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জমিতে প্রবেশ করে এবং ট্রাক্টরের মাধ্যমে পাটক্ষেত নষ্ট করার উদ্যোগ নেয়। খবর পেয়ে তিনি ও স্থানীয় কয়েকজন সেখানে গেলে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তার স্ত্রী রওশন আরাকে টানাহেঁচড়া করে শ্লীলতাহানি করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার টাকার পাটক্ষেত এবং এর আগে ভুট্টাক্ষেত নষ্ট করে মোট ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি সাধনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ৪৪৭, ৪২৭, ৩২৩, ৩৫৪, ১১৪ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য বদরগঞ্জ থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
আগেও অভিযোগ করেছিলেন, সত্যতা পায়নি পুলিশ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত ৪ মার্চ একই বাদী আব্দুল মজিদ নিজের ভুট্টাক্ষেত নষ্ট করার অভিযোগ এনে বুলবুল হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বদরগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তবে পুলিশ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি বলে এলাকাবাসী দাবি করেছেন। এ কারণে নতুন করে আদালতে দায়ের করা মামলাটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পূর্বের অভিযোগের মতো বর্তমান মামলাটিও ব্যক্তিগত শত্রুতা ও প্রতিহিংসা থেকে দায়ের করা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়
রোববার ঘটনাস্থল ঘিরনই মালতোলা গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পাটক্ষেত এখনও দৃশ্যমানভাবে অক্ষত রয়েছে বলে দাবি করছেন গ্রামের বহু মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা আউয়াল হক বলেন, “আমরা প্রতিদিন ওই এলাকার পাশ দিয়ে চলাচল করি। যে পাটক্ষেত নষ্ট হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এ মামলা দিয়ে কিছু মানুষকে হয়রানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।” আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা নবিউল ইসলাম বলেন, “মামলায় যাদের নাম এসেছে, তাদের অনেকেই এলাকায় পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তি। তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে আমরা বিস্মিত হয়েছি। সঠিক তদন্ত হলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজন গ্রামবাসী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত বিরোধ ও জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে এলাকায় একাধিক পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে। বর্তমান মামলাটিও সেই বিরোধের ধারাবাহিকতা হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা
মামলার প্রধান আসামি ও বদরগঞ্জ উপজেলা জিয়া মঞ্চের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই আমাদের নাম জড়ানো হয়েছে। আমরা কেউই ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। তিনি বলেন, এর আগেও একই ব্যক্তি ভুট্টাক্ষেত নষ্টের অভিযোগ এনে থানায় অভিযোগ করেছিলেন। তদন্তে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এখন আবার নতুন করে আদালতে মামলা করে আমাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।” অন্যান্য আসামিপক্ষের সদস্যরাও দাবি করেন, তারা নিরপরাধ এবং আদালতের তদন্তে সত্য উদঘাটিত হবে।
বাদীর বক্তব্য
এ বিষয়ে মামলার বাদী আব্দুল মজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। তাই তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন, “আদালত থেকে মামলাটি তদন্তের জন্য থানায় পাঠানো হয়েছে। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ করবেন। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।তিনি আরও বলেন, তদন্তের আগে মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা উঠে আসবে।”
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মামলাটি ঘিরে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আবার অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঘিরনই মালতোলা গ্রামের এই মামলাটি এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আদালতের নির্দেশে পুলিশের তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
উপদেষ্টা: আলহাজ্ব আব্দুল জববার শেখ, প্রকাশক: মোঃ মাসুম সরদার, সম্পাদক জাবেদ হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক: রফিক ইকবাল, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী সম্পাদক: আসাদুজ্জামান কচি , বার্তা সম্পাদক: নাহিদ জামান, সহকারী বার্তা সম্পাদক: কলি আক্তার, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস, ২১৯, ফকিরেরপুল (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত ও ১৯৫ রহমান ম্যানশন, (১ম গলি), মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। ২৫,স্যার ইকবাল রোড, হোটেল গোল্ডেন কিং ইন্টারন্যাশনাল ভবন, ৫ম তলা, খুলনা।ফোন: ০১৩৩৪-৬৮০৪২০, ই-মেইল: dailyebnews@gmail.com
Copyright © 2026 dailyebnews24. All rights reserved.