পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ওকালতনামা, জামিননামা, হাজিরাসহ সব ফরমের দাম বৃদ্ধি: ছবি (সংগৃহীত) 

নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।। 

রংপুর আদালতে বিচারকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের দাম হঠাৎ করে বাড়ানোয় সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা, গণশুনানি কিংবা বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই একযোগে প্রায় সব ধরনের ফরমের মূল্য বৃদ্ধি করায় আদালতপাড়াজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসন্তোষ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য।

 

জানা গেছে, রংপুর আইনজীবী সমিতির কার্যকরী পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ওকালতনামা, জামিননামা, হাজিরা ফরম, ফিরিস্তি, নকল ফরম ও দরখাস্ত ফরমসহ বিভিন্ন কাগজপত্রের দাম একযোগে বাড়ানো হয়েছে। এতে মামলা দায়ের, জামিন আবেদন কিংবা আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতেও এখন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের।

 

নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, আগে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হওয়া ওকালতনামার দাম বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৫০ টাকা। এর সঙ্গে ৩০ টাকা কোর্ট ফি যোগ হওয়ায় একটি ওকালতনামা কিনতেই ব্যয় হচ্ছে ৪৮০ টাকা। হাজিরার ফরমের দাম ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা করা হয়েছে। জামিননামার ফরম ৮০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৫ টাকা। ফিরিস্তি ফরমের দাম ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নকল ফরম ২৫ টাকার পরিবর্তে এখন ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে দরখাস্ত ফরমের দাম প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৮ টাকা থেকে ১৫ টাকা করা হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব ফরমের মূল্যবৃদ্ধির ফলে একটি সাধারণ মামলা দায়ের করতে বা জামিন নিতে এখন শুধু কাগজপত্র কিনতেই এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এর বাইরে আইনজীবীর ফি, মহুরির খরচ, কোর্ট ফি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ হলে মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে কয়েক হাজার টাকায়। ফলে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আদালতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোই হয়ে উঠছে কঠিন।

 

আদালতপাড়ায় কথা হয় কয়েকজন বিচারপ্রার্থীর সঙ্গে। তারা বলেন, একটি মামলায় যদি একাধিক আসামি থাকে, তাহলে শুধু জামিননামার ফরম কিনতেই কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবার অর্থের অভাবে মামলা পরিচালনা করতে পারছে না। কেউ কেউ মাঝপথে মামলা থেকে সরে দাঁড়াতেও বাধ্য হচ্ছেন।

 

একজন বিচারপ্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একটি মামলায় ১৫ জন আসামি থাকলে শুধু জামিননামার ফরম কিনতেই প্রায় দেড় হাজার টাকা লাগে। এরপর আইনজীবী ও অন্যান্য খরচ তো আছেই। সাধারণ মানুষের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়। আমরা বিচার চাইতে এসে নতুন করে আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছি।”

 

আরেকজন বলেন, “৩-৪ টাকা খরচে ছাপানো একটি ওকালতনামা ৪৫০ টাকায় বিক্রি করা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। আদালতের কাগজপত্র এখন ব্যবসার পণ্যে পরিণত হয়েছে।”

 

শুধু বিচারপ্রার্থীরাই নন, অনেক আইনজীবীও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী পলাশকান্তি নাগ বলেন, “বিচারপ্রার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অবশ্যই সব পক্ষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। নিম্ন আয়ের মানুষ অতিরিক্ত ব্যয়ের ভয়ে আদালতের আশ্রয় নিতে নিরুৎসাহিত হবেন। এটি ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।”

 

তিনি আরও বলেন, “আইনজীবী সমিতির আর্থিক প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু সেই দায় সাধারণ মানুষের ওপর অযৌক্তিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিষয়টি মানবিক ও বাস্তবসম্মতভাবে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।”

 

আইনজীবী রোকেনুজ্জামান রোকন বলেন, “এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সাধারণ আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।”

 

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, ওকালতনামা ছাড়া হাজিরা, জামিননামা ও অন্যান্য ফরম কেন বাধ্যতামূলকভাবে আইনজীবী সমিতির নির্ধারিত উৎস থেকেই কিনতে হবে? সাধারণ স্টেশনারি দোকান কিংবা উন্মুক্ত বাজারে এসব ফরম বিক্রির সুযোগ থাকলে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ হতো এবং বিচারপ্রার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমতো বলে মনে করছেন তারা।

 

বিচারপ্রার্থীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, আদালতে ন্যায়বিচার চাইতে এসে এখন প্রথমেই তাদের অর্থনৈতিক বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রাথমিক ধাপেই যদি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাহলে গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য বিচার পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পিপি আফতাব হোসেন বলেন, “আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফরমের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে হাজিরার ফরমের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। এ নিয়ে আবার সভা ডাকা হতে পারে।”

 

তবে কেন হঠাৎ করে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এত বড় পরিসরে মূল্যবৃদ্ধি করা হলো—এ বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, ভেন্ডারদের কাছে শুধু নতুন মূল্যতালিকা পাঠিয়ে দেওয়া হলেও সাধারণ আইনজীবী বা বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।

 

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আদালত হচ্ছে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। সেখানে মামলা পরিচালনার প্রাথমিক খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তারা বলছেন, ন্যায়বিচার যেন অর্থবানদের একচেটিয়া সুবিধায় পরিণত না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই নজর দিতে হবে।

 

এদিকে আদালতপাড়ায় চলমান ক্ষোভের প্রেক্ষিতে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং কাগজপত্রের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন বিচারপ্রার্থী, মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন আইনজীবীরা। তাদের মতে, মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় আদালতসংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই রাখতে হবে।