
বদরগঞ্জে আরিফুল হত্যার আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে শহীদ মিনারের সামনে রাস্তা অবরোধ। ছবি দৈনিক ইবিনিউজ
নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জে আরিফুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বদরগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে নিহত আরিফুলের পরিবার ও এলাকাবাসী। মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেলে ৪ টার দিকে শুরু হয় এই অবরোধ কর্মসূচি। এতে রাস্তার দুপাশে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ২ ঘন্টা পর পুলিশের আশ্বাসে রাস্তা ছেড়ে বদরগঞ্জ থানার দিকে মিছিল নিয়ে যায় এলাকাবাসী ও আরিফুলের পরিবার।বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, প্রকাশ্যে দিবালোকে পৌর এলাকার আম্বিয়ার মোড় এলাকায় আরিফুল ইসলামকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার পর প্রায় ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলার মূল অভিযুক্তসহ আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সমাবেশে বক্তব্য দেন স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম সিরাজ ও মোস্তাফিজার রহমান। তারা পুলিশের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করতে হবে। অন্যথায় আমরা থানা ঘেরাও সহ আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো। তারা অভিযোগ করেন, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, একজন মানুষকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। অথচ মূল আসামিরা এখনো আইনের বাহিরে এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে, নিহত আরিফুল ইসলামের বাবা রেজাউল ইসলাম ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে বলেন, আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছু হতে পারে না। আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাই, যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর থেকে আমরা পরিবার নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার না হওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে আমাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ মে বিকেলে বদরগঞ্জ উপজেলার বালুয়াভাটা আম্বিয়ার মোড় এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামকে। নিহত আরিফুল ইসলাম (২৮) পৌরসভার পাঠানপাড়া গ্রামের রেজাউল ইসলামের ছেলে।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আরিফুল ছিলেন শান্ত স্বভাবের একজন সাধারণ মানুষ। ঘটনার সময় তিনি রেলঘুমটির রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রতিপক্ষের লোক ভেবে তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, গত বছরের ৫ এপ্রিল টিনের দোকানঘর নির্মাণ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষে লাভলু মিয়া নামে এক কর্মী নিহত হন। এ ঘটনায় বদরগঞ্জ থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এরপর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা ও বিরোধ চলছিল।ঘটনার দিন রংপুর আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিতে যান কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য মমিনুলসহ পাঁচজন। একই সময়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন আরেক মামলার আসামি ফিরোজ শাহ শহ তার অনুসারীরা। আদালত প্রাঙ্গণে ফিরোজ শাহের অনুসারীদের সঙ্গে মমিনুল গ্রুপের সংঘর্ষ বাঁধে। এতে উভয়পক্ষের কয়েকজন আহত হন। পরে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও আদালত থেকে বদরগঞ্জে ফেরার পর আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিশোধ নিতে মমিনুল ও তার অনুসারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষকে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা ফিরোজ শাহের বাড়িতে হামলার চেষ্টা চালায়। এরপর ফিরোজ শাহের পক্ষের লোকজনও প্রতিপক্ষের সন্ধানে বের হয়। বিকেল চারটার দিকে বালুয়াভাটা আম্বিয়ার মোড় এলাকায় প্রতিপক্ষের সদস্য ভেবে ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামকে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ ঘটনায় নিহত আরিফুল ইসলামের বাবা রেজাউল ইসলাম বাদী হয়ে বদরগঞ্জ থানায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এছাড়া আরও পাঁচ থেকে ছয়জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন, আরিফুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, জামাল বাদশা (২৪), সোহাগ বাবু (১৯), সোহেল রানা (২৮) ও গোপাল ব্যানার্জি। তবে মামলার আরও কয়েকজন মূল আসামি এখনো আত্মগোপনে রয়েছে। আরিফুল ইসলাম হত্যা মামলাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পুলিশ। ঘটনার পরপরই অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার বাকি অভিযুক্তরা আত্মগোপনে রয়েছে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনসহ একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। প্রযুক্তির সহায়তাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্তের কাজ চলমান আছে। তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেবে না। যেসব আসামি এখনো পলাতক রয়েছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।এছাড়াও ওসি বলেন, নিহতের পরিবারসহ স্থানীয়দের উদ্বেগ ও দাবির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। জনমনে যেন কোনো ধরনের শঙ্কা বা বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সেজন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি পাওয়া যাবে বলে আমরা আশাবাদী। এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সকল আসামিকে গ্রেপ্তার করে বিচার নিশ্চিত না করা হলে জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে।