রিয়াদ ইসলাম, রংপুর।।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় বিএনপির ৪৩ জন নেতা-কর্মী এবং ৬০ জন সাধারণ নাগরিকের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-তে আনুষ্ঠানিক যোগদানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার (১ জুন) বিকেলে কাউনিয়া উপজেলা এনসিপি কার্যালয়ে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিএনপি থেকে আসা এসব নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দলে বরণ করে নেয় এনসিপি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। এ সময় তিনি নতুন যোগদানকারীদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও মাল্যদান করে স্বাগত জানান এবং তাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আতাউর রহমান, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আলী এবং সাবেক সেক্রেটারি রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ৪৩ জন নেতা-কর্মী এনসিপিতে যোগদান করেন। তাদের সঙ্গে আরও ৬০ জন সাধারণ নাগরিকও দলটির আদর্শ ও কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়ে এনসিপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আখতার হোসেন বলেন, “আজ যারা বিএনপি থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগদান করেছেন, তারা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং একটি আদর্শিক অবস্থান থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমরা সবাই একসঙ্গে রাজপথে ছিলাম। গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছি। কিন্তু সেই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক রাজনৈতিক দল ব্যর্থ হয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, “গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ যে রায় দিয়েছিল, যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল, তা বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিএনপি সেই গণরায়কে অস্বীকার করেছে। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা এখন অনেকেই ভুলে যেতে বসেছে। কিন্তু এনসিপি সেই দাবিগুলোকে সামনে রেখেই রাজনীতি করছে।”
আখতার হোসেন আরও বলেন, “যারা আজ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তারা কেবল নতুন সদস্য নন; তারা জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধা। তারা রাজপথে সংগ্রাম করেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, তাদের অংশগ্রহণ এনসিপির সাংগঠনিক শক্তিকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং জনগণের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বেগবান করবে।”
তিনি বলেন, “এনসিপি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দল নয়। এটি জনগণের আকাঙ্ক্ষার রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ। জনগণের ভোট, মতামত এবং গণরায়কে সম্মান করেই একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। যারা গণভোট, সংস্কার এবং জবাবদিহিতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য এনসিপির দরজা সবসময় উন্মুক্ত।”
অনুষ্ঠানে যোগদানকারী নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন টেপামধুপুর ইউনিয়নের সাবেক বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করেছি। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা মনে করেছি, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। সেই বিশ্বাস থেকেই আমরা এনসিপিতে যোগদান করেছি।”
নতুন যোগদানকারীদের অনেকেই বলেন, দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভাজন, সংঘাত ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিতামূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা এনসিপির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করবে।
অনুষ্ঠিতে বক্তারা আরও বলেন, দেশের তরুণ সমাজ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক এবং সাধারণ নাগরিকদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এনসিপি কাজ করে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
যোগদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ এনসিপির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছেন। জনগণের প্রত্যাশা ও নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রতি আস্থার কারণেই দলটির সাংগঠনিক বিস্তার ঘটছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানের শেষে নতুন সদস্যদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয় এবং দলীয় পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার শপথ গ্রহণ করা হয়। পরে উপস্থিত নেতাকর্মীরা সংগঠনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।