রিয়াদ ইসলাম, রংপুর।। 

রংপুর মহানগরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ব্যানারে একটি ঝটিকা মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ৫৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে একদল যুবককে মহানগর ছাত্রলীগের ব্যানার হাতে নিয়ে মিছিল করতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সোমবার (১ জুন) দুপুরের পর থেকে ভিডিওটি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ এবং ব্যক্তিগত আইডিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে ভিডিওটি ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওটি হাজার হাজার মানুষের নজরে আসে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, রংপুর মহানগর ছাত্রলীগের ব্যানার বহন করে ১০ থেকে ১২ জন যুবক সড়কে মিছিল করছে। তাদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক এবং মাথায় ক্যাপ থাকায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাত্র তিনজনের মুখ স্পষ্ট দেখা যায়। মিছিলটি অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য পরিচালিত হলেও এতে উচ্চস্বরে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া হয়।

মিছিলের ব্যানারে লেখা ছিল, “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল”। ব্যানারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ছাড়াও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ছবিও ব্যবহার করা হয়।

মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা একাধিক স্লোগান দেন, “শেখ হাসিনা, ভয় নাই রাজপথ ছাড়ি নাই”, “শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে”, “মুক্তি মুক্তি চাই, শেখ হাসিনার মুক্তি চাই”, “মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই”, “মহানগর ছাত্রলীগ, নেতা মোদের শেখ মুজিব”, “অবৈধ নিষেধাজ্ঞা মানি না, মানব না”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিওটি রংপুর নগরীর পশ্চিম বাবুখাঁ এলাকার নজরুল পাঠাগারের সামনে আরকে রোডে ধারণ করা হয়েছে। তবে ভিডিওটি ঠিক কখন ধারণ করা হয়েছে, সেটি নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। এ কারণে তদন্তকারীরা ভিডিওটির সময়, স্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরপরই রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) বিশেষ তৎপরতা শুরু করে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এলাকা এবং বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদেরও মাঠে নামানো হয়েছে। ভিডিওতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভিডিওতে অংশগ্রহণকারীদের মুখ আড়াল করার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, পরিকল্পিতভাবেই অংশগ্রহণকারীরা পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন। ফলে ভিডিও বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমান বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওটি আমরা দেখেছি এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে ধারণা করা হচ্ছে, ভিডিওটি আগে ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে প্রচার করা হয়েছে। কারণ ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে আজ বা আজ সকালে এমন কোনো মিছিল হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।”

তিনি আরও বলেন, “তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। ভিডিওটি কোথায়, কখন এবং কারা ধারণ করেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কাউকে শনাক্ত করা গেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে ভাইরাল হওয়া যেকোনো ভিডিও বা প্রচারণার পেছনের বাস্তবতা যাচাই করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখছেন। কেউ কেউ এটিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে মনে করছেন, আবার অনেকে ভিডিওটির সময়কাল ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এ ধরনের ভিডিও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রকৃত ঘটনা জনগণের সামনে তুলে ধরা জরুরি। একই সঙ্গে যারা আইন লঙ্ঘন করে নিষিদ্ধ সংগঠনের নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের নামে প্রকাশ্যে বা গোপনে কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে সংগঠিত প্রচারণা এবং হঠাৎ করে ঝটিকা কর্মসূচির মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

রংপুর মহানগর পুলিশ ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যেকোনো সংগঠনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে ভাইরাল ভিডিওটির উৎস, ধারণের সময়, অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।