নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোনো সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক আদর্শিক, বিশ্বাসগত এবং ঈমান-আকিদার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুদমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল হওয়ায় ইসলামী ব্যাংকের প্রতি তাদের আগ্রহ ও সমর্থন রয়েছে।

সোমবার (১ জুন) বিকেলে রংপুরের বদরগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বদরগঞ্জ উপজেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে একটি মহল ইসলামী ব্যাংককে জামায়াতের সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করেছে। বাস্তবে ইসলামী ব্যাংক একটি স্বতন্ত্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। আমাদের সম্পর্ক হচ্ছে আদর্শিক ও বিশ্বাসের। আমরা সুদমুক্ত অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি, তাই ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের সমর্থন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী অর্থনীতির প্রতি আস্থাশীল। তারা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চায়, যেখানে সুদের পরিবর্তে ন্যায়ভিত্তিক ও অংশীদারিত্বমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে। ইসলামী ব্যাংকের প্রতি মানুষের আগ্রহের অন্যতম কারণ হচ্ছে এই বিশ্বাস।”

নিজের ব্যাংকিং সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি নিজেও ইসলামী ব্যাংকে আমানত রেখেছি। এটি কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আদর্শের কারণে। আমি সুদমুক্ত অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি এবং সে কারণেই ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা রয়েছে।”

এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, বিগত সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংককে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন উপায়ে বের করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার ভাষ্য, “বিগত সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এর ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি নানা সংকটের মুখে পড়ে। সাধারণ গ্রাহক ও আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল। এখনো কিছু গোষ্ঠী ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা নষ্টের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”

 

তিনি বলেন, “ব্যাংকের গ্রাহকরা এখন অনেক সচেতন। তারা বুঝতে পেরেছেন কারা ব্যাংকটিকে দুর্বল করতে চায় এবং কারা এর স্থিতিশীলতা চায়। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কোনো অপশক্তিকেই ব্যাংকের ক্ষতি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।”

সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের ওপর পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের ন্যায্য দাবি উপস্থাপনের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে কোনো গ্রাহক বা সাধারণ মানুষের ওপর বলপ্রয়োগ কাম্য নয়।

 

তিনি বলেন, “যারা তাদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তারা যদি শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরে, তাহলে তাদের কথা শোনা উচিত। তাদের ওপর লাঠিচার্জ বা শক্তি প্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের উদ্বেগ দূর করা, তাদের ভয় দেখানো নয়।”

দেশের বর্তমান সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

 

তিনি বলেন, “মাদক আজ দেশের যুবসমাজের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। মাদকের কারণে পরিবার ধ্বংস হচ্ছে, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে এবং অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার চাইলে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা।”

 

তিনি আরও বলেন, “চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের সংস্কৃতি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে যারা অপরাধ করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।

ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বদরগঞ্জ উপজেলা শাখার আমীর মাওলানা কামরুজ্জামান কবির। অনুষ্ঠানে স্থানীয় নেতাকর্মী, পেশাজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা কামরুজ্জামান কবির বলেন, ঈদ মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। সেই শিক্ষা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত করতে হবে। ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তুলতে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা মেনহাজুল ইসলাম, নায়েবে আমীর শাহ মো. রোস্তম আলী, উপজেলা অফিস সেক্রেটারি আবু বক্কর, পৌর আমীর মাওলানা মাহফুজুর রহমান, উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মাওলানা শাহিনুর ইসলাম, যুব বিভাগের সভাপতি মাসুদ হাসান রানা এবং জামায়াত ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

অনুষ্ঠির শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা জাতীয় ঐক্য, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি এবং জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।