পাঁচ দফা দাবিসহ , ২০ জুন তিস্তাপাড়ে মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর।। 

উত্তরাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ তিস্তা নদীর ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিতকরণ এবং বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি। তিস্তাপারের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রকল্পটিকে জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করে দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়েরও দাবি জানানো হয়েছে।

 

রোববার (১৪ জুন) বিকেল সাড়ে ৫টায় রংপুর নগরীর পুরাতন পাবলিক লাইব্রেরি হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল।

 

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য সচিব ও রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক রায়হান সিরাজী, উপদেষ্টা এটিএম আজম খান, কে এম আনোয়ারুল হক কাজল, মাওলানা এনামুল হক, আব্দুল গনি, অ্যাডভোকেট কাওছার আলীসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

 

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, তিস্তা শুধুমাত্র একটি নদী নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা এবং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার দাবি জানানো হলেও আজও বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী কোনো সমাধান বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট এবং বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে তিস্তাপারের লাখো মানুষকে।

 

সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, উজানে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বিশাল অংশজুড়ে জেগে ওঠে চরাঞ্চল। পানি সংকটের কারণে ব্যাহত হয় কৃষিকাজ, কমে যায় ফসল উৎপাদন, সংকুচিত হয় জীববৈচিত্র্য। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির প্রবাহে তিস্তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। নদীভাঙনে প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার গৃহহীন ও ভূমিহীন হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি ও জনপদ।

 

বক্তারা আরও বলেন, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর ২০২৬ সালে শেষ হতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ১৯৮৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে একটি অস্থায়ী সমঝোতা এবং ২০১১ সালে একটি স্থায়ী চুক্তির খসড়া প্রস্তুত হলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ।

 

তারা অভিযোগ করেন, দেশের অন্যান্য বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বছরের পর বছর ধরে সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে আটকে আছে। অথচ এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদী খনন, ভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের প্রতি পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো— তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা, দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ, তিস্তাপারের জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা।

 

বক্তারা বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। তিস্তার ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসবে।

 

সংবাদ সম্মেলন থেকে চলমান জাতীয় বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগামী একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদনের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দাবিগুলো আদায়ে জনমত গড়ে তুলতে আগামী ২০ জুন বৃহৎ মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির আওতায় লালবাগ-ডিসির মোড়, তিস্তা সেতু-কাউনিয়া এবং মহিপুর-বুড়িরহাট সড়কে একযোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে।

 

সংবাদ সম্মেলনে নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তিস্তা নিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ন্যায্য দাবি আর উপেক্ষিত থাকতে পারে না। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তারা তিস্তার ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিতকরণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণে সরকারের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।