নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর।।

উত্তরাঞ্চলের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসার আশায় এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনীয় জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত তদারকি এবং দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে থাকা রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতির কারণে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় আসা রোগীদের অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের দ্বারস্থ হতে।

রবিবার (১৪ জুন) সকালে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের নেতৃত্বে তিন সংসদ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করলে দীর্ঘদিনের এসব সমস্যার ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে।

 

প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এবং রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী। এ সময় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান, বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

যন্ত্রপাতি আছে, সেবা নেই

পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্যরা জানতে পারেন, হাসপাতালের ২৬টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ২৪টিই অচল। এছাড়া ৩টি সিটি স্ক্যান মেশিনের মধ্যে ২টি, ৩টি এমআরআই মেশিনের মধ্যে ২টি এবং ১৩টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ১০টি দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, অচল এক্স-রে মেশিনগুলোর মধ্যে ২০টি এতটাই নষ্ট যে সেগুলো আর মেরামত করা সম্ভব নয়। একইভাবে ২টি সিটি স্ক্যান, ২টি এমআরআই এবং ৮টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

 

ফলে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও রোগনির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত রোগী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন অথবা বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন।

অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ

হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে দেখে সংসদ সদস্যরা দেখতে পান, বহু মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক কক্ষে ধুলোবালি জমে রয়েছে, কোথাও কোথাও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা সরকারি সম্পদ কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে।

 

পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্যরা এ অবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ভোগান্তির শেষ নেই রোগীদের

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রায় প্রতিদিনই তাদেরকে হাসপাতালের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

 

পীরগঞ্জ উপজেলার রোগীর স্বজন বকুল মিয়া বলেন,“গরিব মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য। কিন্তু এখানে এসে যদি সব পরীক্ষা বাইরে করতে হয়, তাহলে সরকারি হাসপাতালের সুবিধা কোথায়? একটি সিটি স্ক্যান করাতে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।”

 

দিনাজপুর থেকে আসা সাঈদ রহমান নামে এক রোগী বলেন,“চিকিৎসক পরীক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু হাসপাতালে মেশিন সচল নেই। বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে বলা হয়েছে। অনেক রোগী টাকা না থাকায় পরীক্ষাই করাতে পারেন না।”

 

একজন অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন,“হাসপাতালে জনবল কম। রোগীদের ঠিকমতো গাইড করার লোক নেই। এই সুযোগে দালালরা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়।”

সক্রিয় দালালচক্র, বাড়ছে রোগীদের দুর্ভোগ

পরিদর্শনকালে দালালচক্রের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের বিভিন্ন পয়েন্টে সক্রিয় কিছু অসাধু ব্যক্তি রোগীদের বিভ্রান্ত করে নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাচ্ছে।

জনবল সংকট এবং সেবাব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এসব চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

‘উত্তরবঙ্গের মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল রমেক’

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন,“রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরবঙ্গের আট জেলার মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় তদারকির অভাবে হাসপাতালের সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে।”

তিনি বলেন,“সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। জনবল সংকটের কারণে অনেক যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। এ সুযোগে দালালচক্র সক্রিয় হয়েছে। আমরা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছি।”

 

তিনি আরও জানান, হাসপাতালের সার্বিক সমস্যার বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে: এমপি গোলাম রব্বানী

রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেন,“স্বাস্থ্যখাতের সংকট শুধু রংপুরের নয়, এটি সারা দেশের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। তিনি হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত ও জনবল সংকট সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।”

তিনি বলেন,“আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের পর ধাপে ধাপে এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। রমেকের যন্ত্রপাতি সচল করা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং দালালচক্র নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।”

‘স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে রংপুরে আসতে হবে: রায়হান সিরাজী 

রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন,“রংপুর বিভাগের মানুষের চিকিৎসাসেবার বর্তমান চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে রংপুরে এসে নিজ চোখে পরিস্থিতি দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।”

তিনি বলেন,“কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রপাতি অচল পড়ে থাকায় একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রোগীদের দুর্ভোগ লাঘব এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে নতুন যন্ত্রপাতি

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অচল যন্ত্রপাতি সরিয়ে নতুন মেশিন স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ফলে পুরোনো যন্ত্রপাতি যেমন অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে, তেমনি নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের উদ্যোগও বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

মানবিক আচরণের প্রশ্নেও উদ্বেগ

পরিদর্শনের সময় সম্প্রতি এক ইন্টার্ন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মরদেহ আটকে রেখে মৃত ব্যক্তির ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগের ঘটনাও আলোচনায় আসে।

এ ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে সংসদ সদস্যরা বলেন, চিকিৎসাসেবার সঙ্গে মানবিক আচরণ, পেশাগত নৈতিকতা ও রোগীর প্রতি সম্মানবোধ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ ধরনের ঘটনা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্রুত সমাধান না হলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগী বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতির পাশাপাশি রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা হাসপাতালটির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত অচল যন্ত্রপাতি অপসারণ, নতুন মেশিন স্থাপন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, দালালচক্র নির্মূল এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। তাই রমেক হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি হাসপাতালের সমস্যা নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখা প্রয়োজন।