রংপুর ব্যুরো:

‎স্বামীর সঙ্গে সুখের সংসার, ভালোবাসা আর নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন জান্নাতুন বাকিয়া পুষ্প। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ পরিণত হয়েছে দীর্ঘশ্বাস, হতাশা ও বিচারহীনতার এক বেদনাদায়ক গল্পে। ১২ লাখ টাকা যৌতুক নেওয়ার পরও তাকে দাম্পত্য জীবনের স্বীকৃতি না দিয়ে গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বামী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে গত ছয় বছর ধরে সেনানিবাস, থানা ও আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত বিচার পাননি বলে দাবি ভুক্তভোগীর। জানা যায়, দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বারীর মেয়ে জান্নাতুন বাকিয়া পুষ্পর সঙ্গে ২০১৫ সালে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার অনন্তরামপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে ইউনুস আলী। সে সময় ইউনুস আলী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বিয়ের পর কয়েক বছর স্বাভাবিক সংসার চললেও চাকরির কথা বলে দীর্ঘদিন বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য করেন স্বামী। সংসার রক্ষার স্বার্থে তিনি বিষয়টি মেনে নেন। কিন্তু একপর্যায়ে জানতে পারেন, তাকে না জানিয়ে ও তার অনুমতি ছাড়াই ইউনুস আলী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এ ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন।

‎পুষ্প জানান, দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি জানার পর তিনি প্রথমে রংপুর সেনানিবাসে লিখিত অভিযোগ করেন। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার আশ্বাস পেলেও কার্যকর কোনো সমাধান না হওয়ায় পরে আদালতের শরণাপন্ন হন। মামলার পর আদালত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন,আমি ছয় বছর ধরে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করছি। একজন নারী হিসেবে আমার অধিকার, সম্মান ও স্বীকৃতির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। আমি চাই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং আইনের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা হোক।”

‎ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে প্রায় ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। মেয়ের সুখী ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ওই অর্থের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সেই অর্থ নেওয়ার পরও মেয়েকে দাম্পত্য জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। পুষ্পর স্বজনরা জানান, বর্তমানে তিনি বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলমান মামলা, সামাজিক চাপ, মানসিক কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তার দিন কাটছে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, একজন নারী হিসেবে তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

‎এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন,

‎”বিষয়টি আদালতসংশ্লিষ্ট হওয়ায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আদালতের নির্দেশনা এবং মামলার অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আইন সবার জন্য সমান এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”

‎স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যৌতুক, পারিবারিক প্রতারণা ও অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ের মতো অভিযোগ সমাজে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এসব ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ হলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ফিরে পাবেন। ভুক্তভোগী পরিবার বলছে, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। বরং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত দেখতে চান। তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এদিকে অভিযুক্ত সেনা সদস্য ইউনুস আলীর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।