নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জ প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সংগঠনের দুই সদস্যকে সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অব্যাহতি পাওয়া দুইজন হলেন—প্রেসক্লাবের সদস্য সোহেল রানা ওরফে রানা ইসলাম (দৈনিক দাবানল) এবং কার্যকরী পরিষদের সদস্য মো. মাহফুজার রহমান। প্রেসক্লাবের কার্যকরী পরিষদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রেসক্লাব সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ জুলাই সংগঠনের কার্যকরী পরিষদের এক সভায় সাম্প্রতিক সাংগঠনিক পরিস্থিতি, গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কর্মকাণ্ড, সদস্যদের আচরণবিধি এবং প্রেসক্লাবের সামগ্রিক শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট দুই সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, সংগঠনের ভেতরে তাঁদের ভূমিকা এবং এসব কর্মকাণ্ডের ফলে প্রেসক্লাবের শৃঙ্খলা, ঐক্য ও সুনামের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। পরবর্তীতে উপস্থিত সদস্যদের মতামত ও আলোচনার ভিত্তিতে কার্যকরী পরিষদ সর্বসম্মতভাবে তাঁদের সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বদরগঞ্জ প্রেসক্লাব দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে কাজ করে আসছে। এ সংগঠনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, সংবাদপেশার নৈতিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্যভিত্তিক সংবাদচর্চা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে ভূমিকা রাখা হয়। ফলে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, গঠনতান্ত্রিক চর্চা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং সদস্যদের দায়িত্বশীল আচরণকে প্রেসক্লাবের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংগঠনের দায়িত্বশীলদের ভাষ্য, এসব মৌলিক নীতির পরিপন্থী কোনো কর্মকাণ্ড ঘটলে তা শুধু প্রেসক্লাবের ভেতরের পরিবেশকে অস্থির করে তোলে না, একই সঙ্গে সংগঠনের সামগ্রিক মর্যাদা ও জনআস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কার্যকরী পরিষদের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, প্রেসক্লাবের শৃঙ্খলা, মর্যাদা ও সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে এবং সংগঠনের গঠনতন্ত্রের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে এ অব্যাহতির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের গণমাধ্যমকর্মী, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং সর্বসাধারণকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। প্রেসক্লাবের দায়িত্বশীলরা মনে করছেন, একটি পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে বদরগঞ্জ প্রেসক্লাবের গ্রহণযোগ্যতা, ঐক্য এবং গঠনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল।
প্রেসক্লাব সূত্রে আরও জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনের ভেতরে কিছু কর্মকাণ্ড ও আচরণ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। কয়েকজন সদস্যের পক্ষ থেকে সেসব বিষয় কার্যকরী পরিষদের নজরে আনা হলে বিষয়টি নিয়ে অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে কার্যকরী পরিষদের সভায় অভিযোগগুলোর বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হন সদস্যরা। সভায় উপস্থিত সদস্যদের অনেকেই মত দেন, সাংবাদিকদের সংগঠনে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তা কখনোই গঠনতন্ত্র, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মানবোধের সীমা অতিক্রম করতে পারে না। সেই জায়গা থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আলতাফ হোসেন দুলাল বলেন, “প্রেসক্লাব একটি পেশাজীবী সংগঠন। এখানে প্রত্যেক সদস্যের ওপর সংগঠনের গঠনতন্ত্র, শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করার নৈতিক ও সাংগঠনিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। কার্যকরী পরিষদের সভায় বিস্তারিত আলোচনা, অভিযোগ পর্যালোচনা এবং সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে সর্বসম্মতভাবে দুই সদস্যকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি কারও প্রতি ব্যক্তিগত যায়গা থেকে নেওয়া হয়নি বরং সংগঠনের সামগ্রিক স্বার্থ, মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই বদরগঞ্জ প্রেসক্লাব একটি সুস্থ, দায়িত্বশীল ও পেশাদার সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে কাজ করুক। এখানে ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীগত অবস্থানের চেয়ে সংগঠনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। কেউ যদি এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, যা সংগঠনের ঐক্য নষ্ট করে, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে বা প্রেসক্লাবের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে, তাহলে কার্যকরী পরিষদকে অবশ্যই দায়িত্বশীল অবস্থান নিতে হবে।”
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সরকার বলেন, “প্রেসক্লাবের মর্যাদা, ঐক্য ও পেশাগত পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। কার্যকরী পরিষদ গঠনতন্ত্রের আলোকে বিষয়টি বিবেচনা করেছে এবং সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, সংগঠনের ভেতরে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে হলে কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়।”
তিনি বলেন, “সাংবাদিক সংগঠন কেবল একটি নামমাত্র প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি একটি দায়িত্ববোধ, নৈতিক অবস্থান এবং পেশাগত ঐক্যের প্রতীক। এখানে প্রত্যেক সদস্যের আচরণ পুরো সংগঠনের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই কেউ যদি এমন কোনো ভূমিকা নেন, যা সংগঠনের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে, বিভাজন তৈরি করে বা গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাহলে কার্যকরী পরিষদের পক্ষে নীরব থাকা সম্ভব নয়। আমরা চাই, ভবিষ্যতে সবাই সংগঠনের নীতিমালা মেনে চলবেন এবং একটি ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখতে সহযোগিতা করবেন।”
সভায় উপস্থিত একাধিক সদস্য জানান, প্রেসক্লাবের মতো একটি পেশাজীবী সংগঠনে মতভেদ বা ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যদি সংগঠনের গঠনতন্ত্রবিরোধী আচরণ, শৃঙ্খলাভঙ্গ বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অমান্যের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে তা পুরো সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রেসক্লাব একটি বার্তা দিয়েছে যে, সংগঠনের স্বার্থের প্রশ্নে কার্যকরী পরিষদ আপস করবে না এবং গঠনতন্ত্রের বাইরে কোনো ধরনের আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
প্রেসক্লাবের দায়িত্বশীলদের ভাষ্য, স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত ঐক্য, তথ্যভিত্তিক সংবাদচর্চা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ বজায় রাখতে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো প্রয়োজন। সেই কাঠামো টিকিয়ে রাখতে সদস্যদের দায়িত্বশীলতা যেমন জরুরি, তেমনি সংগঠনের নেতৃত্বেরও নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। বদরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে তারা সেই দায়িত্বশীলতার অংশ হিসেবেই দেখছেন।
প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতেও সংগঠনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, শৃঙ্খলা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে গঠনতন্ত্রের আলোকে প্রয়োজনীয় সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান এবং সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বদরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক অবস্থান আরও সুসংহত হবে এবং স্থানীয় সাংবাদিক সমাজে একটি দায়িত্বশীল বার্তা পৌঁছাবে। এ সময় বদরগঞ্জ প্রেসক্লাবের অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।