দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলাও আমাদের দায়িত্ব’— মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত

নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।। 

প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে রংপুরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল মকবুল তাহফিজুল কুরআন একাডেমী ও কওমী মাদ্রাসা। পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃক্ষপ্রেম ও সবুজায়নের গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শতাধিক শিক্ষার্থীকে নিয়ে রংপুর জেলা স্কুল মাঠে আয়োজিত ১৫ দিনব্যাপী রংপুর বিভাগীয় বৃক্ষ মেলা-২০২৬ পরিদর্শন করা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ, ঔষধি ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছের চারা ক্রয় করে।

মেলার প্রতিটি স্টলে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। কোন গাছ পরিবেশের জন্য বেশি উপকারী, কোন গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়, কোন গাছ ফল দেয় এবং কীভাবে একটি গাছের সঠিক পরিচর্যা করতে হয়—এসব বিষয়ে তারা নার্সারির উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে। শিক্ষকদের দিকনির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা গাছের গুরুত্ব, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।

 

মেলায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। অনেকেই নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে গাছের চারা কিনে বাড়ির আঙিনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস কিংবা আশপাশের খালি জায়গায় রোপণের আগ্রহ প্রকাশ করে। এ সময় মাদ্রাসার শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বলেন, একটি গাছ শুধু অক্সিজেনই দেয় না, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বনভূমি ধ্বংস এবং পরিবেশ দূষণের কারণে মানবসভ্যতা নানা সংকটের মুখোমুখি। এসব সংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে ছোটবেলা থেকেই পরিবেশবান্ধব মানসিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে নিয়মিত বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বৃক্ষ মেলা পরিদর্শনও তারই একটি অংশ।

 

এ বিষয়ে আল মকবুল তাহফিজুল কুরআন একাডেমী ও কওমী মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত বলেন,

“ইসলাম মানুষকে পৃথিবীকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখার শিক্ষা দিয়েছে। একটি গাছ রোপণ করাও ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মহৎ ও সওয়াবের কাজ। মহানবী (সা.) বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তাই আমরা চাই, আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু কুরআন-হাদিস ও দ্বীনি শিক্ষায় দক্ষ হবে না; একই সঙ্গে তারা পরিবেশ সচেতন, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে উঠবে।”

 

তিনি আরও বলেন,  “আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাদের হাতে যদি আমরা একটি গাছ তুলে দিতে পারি, তাহলে তারা ভবিষ্যতে একটি সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। এ কারণেই আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষ মেলায় এসেছি এবং তাদের উৎসাহিত করেছি নিজ হাতে গাছের চারা কিনে রোপণ করতে। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি শিক্ষার্থী যদি অন্তত একটি করে গাছ রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নেয়, তাহলে আমাদের সমাজ আরও সবুজ ও পরিবেশবান্ধব হবে।”

 

তিনি বলেন, “দ্বীনি শিক্ষা কখনোই কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষার্থীকে নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা শেখানোও শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল মকবুল তাহফিজুল কুরআন একাডেমী ও কওমী মাদ্রাসা সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে।”

 

মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানান, এ ধরনের শিক্ষা সফরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। তারা পরিবেশ সংরক্ষণ, গাছের পরিচর্যা, কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করে, যা তাদের ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

মেলায় বিভিন্ন নার্সারির স্টলে দেশীয় ও বিদেশি নানা জাতের ফলজ, বনজ, ঔষধি, ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছের সমাহার শিক্ষার্থীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। তারা গাছের নাম, বৈশিষ্ট্য, রোপণের উপযুক্ত সময়, পরিচর্যার নিয়ম এবং পরিবেশে প্রতিটি গাছের অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে নিজের বাড়িতে ছোট একটি বাগান গড়ে তোলার আগ্রহও প্রকাশ করে।

 

পরিদর্শন শেষে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন এবং প্রত্যেককে অন্তত একটি করে গাছ রোপণ ও নিয়মিত পরিচর্যার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণকে আরও সবুজ ও মনোরম করে তুলতে নতুন করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।

 

স্থানীয় সচেতন মহল মাদ্রাসাটির এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা নতুন প্রজন্মকে একটি আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এমন উদ্যোগ দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও অনুসরণ করলে সবুজায়ন আন্দোলন আরও বেগবান হবে এবং পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

 

সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দিয়ে পরিবেশ রক্ষার যে বার্তা দিয়েছে আল মকবুল তাহফিজুল কুরআন একাডেমী ও কওমী মাদ্রাসা, তা শুধু একটি শিক্ষা সফর নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃতিপ্রেমী, দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।