নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।। 

‎বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জেলা রংপুরের জনসংখ্যা, শিক্ষা, জনঘনত্ব, সামাজিক উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের সর্বশেষ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর জেলা রিপোর্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রংপুর জেলার মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৬৯ হাজার ৬১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬০৮ জন এবং নারী ১৬ লাখ ১ হাজার ৬৭ জন। অর্থাৎ জেলার মোট জনসংখ্যার ৫০.৫০ শতাংশ নারী এবং ৪৯.৫০ শতাংশ পুরুষ। ফলে এবারও রংপুরে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কিছুটা বেশি। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জেলার শিক্ষা, জনঘনত্ব, কৃষি, অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে

‎প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রংপুর জেলার প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করেন ১ হাজার ৩২০ জন মানুষ। উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর জেলা হওয়া সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ভূমির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ার কারণে আবাসন, সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া ভবিষ্যতে এই জনসংখ্যার চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

‎শিক্ষায় অগ্রগতি, তবে বৈষম্য রয়ে গেছে

‎জনশুমারি প্রতিবেদনে শিক্ষা খাতের ইতিবাচক অগ্রগতির চিত্রও উঠে এসেছে। রংপুর জেলার শিক্ষার হার ৭০.৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে—পুরুষের শিক্ষার হার ৭৩.৩৪ শতাংশ। নারীর শিক্ষার হার ৬৭.৯২ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত এক দশকে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং নারী শিক্ষায় বিশেষ উদ্যোগের ফলে সাক্ষরতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে নারী ও পুরুষের সাক্ষরতার ব্যবধান এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

‎উত্তরাঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র

‎রংপুর শুধু একটি জেলা নয়; এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। বর্তমানে রংপুর বিভাগ, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, আদালত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রস্থল এই জেলা। ১৭৬৫ সালে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৭৬৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর রংপুর বিভাগীয় সদর দপ্তর হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজ এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা হিসেবে পরিচিত।

‎ইতিহাসের পাতায় রংপুর

‎ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীনকালে রংপুর অঞ্চল কামরূপ রাজ্য এবং পরে কোচ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুসলিম শাসনামলে এ অঞ্চল ফকিরকুণ্ডি নামে পরিচিত ছিল। আবার বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণায় রংপুরের প্রাচীন নাম জঙ্গপুর বলেও উল্লেখ রয়েছে। নামকরণ নিয়েও রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক মত। একটি মতে, ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে ব্যাপক নীল চাষ হতো। স্থানীয়রা নীলকে “রং” নামে অভিহিত করতেন। সেই “রং” থেকেই “রঙ্গপুর” এবং পরে “রংপুর” নামের উৎপত্তি। অন্যদিকে আরেকটি মত বলছে, কামরূপের রাজা ভগদত্তের রঙ্গমহল থেকেই “রঙ্গপুর” নামটি এসেছে।আবার ম্যালেরিয়ার ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের কারণে একসময় এ অঞ্চলকে যমপুর বলেও ডাকা হতো।

‎আন্দোলন-সংগ্রামের জেলা

‎ঐতিহাসিকভাবে রংপুর শুধু কৃষির জন্য নয়, আন্দোলন-সংগ্রামের জন্যও সুপরিচিত। ব্রিটিশবিরোধী কৃষক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে রংপুরের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ত্রিশের দশকে কৃষক আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তারের কারণে একসময় রংপুরকে “লাল রংপুর” নামেও অভিহিত করা হতো।

‎কৃষির রাজধানী

‎রংপুরের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি কৃষি। এ জেলার উর্বর মাটিতে উৎপাদিত হয়, ধান,আলু,পাট,ভুট্টা,গম,তামাক,হাড়িভাঙ্গা আম,বিভিন্ন সবজি। বিশেষ করে আলু উৎপাদনে রংপুর দেশের অন্যতম শীর্ষ জেলা। একইভাবে তামাক উৎপাদনেও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে এ অঞ্চল। সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সেচ ব্যবস্থা, উচ্চফলনশীল বীজ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে কৃষি উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

‎জিআই পণ্য 

‎রংপুরের ঐতিহ্যের অন্যতম বড় পরিচয় শতরঞ্জি।প্রায় ৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই হস্তশিল্প বর্তমানে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। রংপুরের শতরঞ্জি এখন ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। হাজার হাজার তাঁতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন এই শিল্প। এছাড়াও মিঠাপুকুর উপজেলার বিখ্যাত হাঁড়িভাঙা আমের জনক বা আবিষ্কারক হলেন নফল উদ্দিন পাইকার। তিনি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানী গ্রামের একজন সাধারণ ও বৃক্ষপ্রেমী মানুষ ছিলেন। আনুমানিক ১৯৪৯ সালের দিকে তিনি একটি পরিত্যক্ত বাগান থেকে এই আমের চারাটি সংগ্রহ করে রোপণ করেন, যা আজ বিশ্ববিখ্যাত হাঁড়িভাঙা আমের ‘মাতৃগাছ’ হিসেবে পরিচিত। শুরুতে এই আমের নাম ছিল ‘মালদিয়া’। নফল উদ্দিন পাইকার খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের শুষ্ক মাটির কারণে চারা গাছের নিচে বা ডালে ফুটো করা মাটির হাঁড়িতে পানি দিয়ে ফিল্টারের মতো সেচ দিতেন। একদিন রাতে কিছু দুষ্টু ছেলে বা কোনো কারণে সেই মাটির হাঁড়িটি ভেঙে যায়। পরবর্তীতে ওই গাছে প্রচুর সুস্বাদু আম ধরে। বাজারে বিক্রির সময় মানুষ এই আমের জাত জানতে চাইলে নফল উদ্দিন বলতেন, “যে গাছের হাঁড়ি ভেঙে গিয়েছিল, এটি সেই গাছের আম”। এভাবেই আমটির নাম হয়ে যায় হাঁড়িভাঙা। নফল উদ্দিন এই আমের সূচনা করলেও এটিকে বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় ও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে মূল অবদান রেখেছেন কৃষি পদকপ্রাপ্ত সফল কৃষি উদ্যোক্তা আব্দুস সালাম সরকার। তিনি ১৯৯০-এর দশক থেকে এই আমের ব্যাপক চাষ শুরু করেন। হাঁড়িভাঙা আম অত্যন্ত সুস্বাদু, সুমিষ্ট এবং সম্পূর্ণ আঁশবিহীন। এই আমটির অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি বাংলাদেশের জিআই  পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

‎ভাওয়াইয়ার রাজধানী

‎সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও রংপুরের রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।ভাওয়াইয়া গান, পল্লীগীতি, লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ মেলা ও লোকজ ঐতিহ্যের কারণে রংপুরকে ভাওয়াইয়ার রাজধানী বলা হয়। উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের হাত ধরে ভাওয়াইয়া বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে।

‎উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা

‎অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, রংপুরে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটানো গেলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে রংপুর দেশের অন্যতম আধুনিক ও সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে আরও এগিয়ে যাবে।

‎পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ দলিল

‎বিশেষজ্ঞদের মতে, জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর জেলা রিপোর্ট শুধু জনসংখ্যার পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জেলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সরকার পরিকল্পনা প্রণয়নে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সাক্ষরতার হার, নারীর অংশগ্রহণ, কৃষি উৎপাদন, ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে রংপুর আজ উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনাময় জেলার কাতারে আরও দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে। উন্নয়ন পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন হলে আগামী দিনে রংপুর দেশের অন্যতম শক্তিশালী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।