নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।। 

রাজনীতি তখনই সুন্দর ও কল্যাণমুখী হয়, যখন তা ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা না হয়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। বর্তমান বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিভাজনের পরিবর্তে যুক্তি, সংলাপ, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রংপুর মহানগর ইসলামী আন্দোলনের সহ-সভাপতি মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত

তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত্তি শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্যেই প্রকৃত রাজনৈতিক সাফল্য নিহিত। মতের পার্থক্য থাকতেই পারে, তবে সেই ভিন্নমত যেন কখনো শত্রুতায় রূপ না নেয়—এটাই হওয়া উচিত সুস্থ রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত বলেন, “রাজনীতি তখনই সুন্দর, যখন তা মানুষের জীবনের মান উন্নত করার প্রতিযোগিতা হয়—ক্ষমতার লড়াই নয়।” রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সংঘাতের কারণ না বানিয়ে যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। কারণ একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যত বেশি সহনশীল, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হবে, সেই দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তত বেশি শক্তিশালী হবে।

তিনি আরও বলেন, আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উত্তেজনা নয়—যুক্তি; বিভাজন নয়—সংলাপ; প্রতিশোধ নয়—ন্যায়বিচার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা পরিহার করে ভিন্নমতকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। কারণ মতের ভিন্নতাই রাজনীতির সৌন্দর্য; শত্রুতা নয়।

ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা জরুরি

মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিতের মতে, রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক দল ও মতের মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পার্থক্য যেন সামাজিক বিভাজন, বিদ্বেষ কিংবা সংঘাতের জন্ম না দেয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও রাষ্ট্র, সংবিধান, আইনের শাসন এবং মানুষের মৌলিক মর্যাদার প্রতি সবার সম্মান অটুট থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দেশটা আমাদের সবার। তাই রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে রাখতে হবে। ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর স্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি মনে করেন, রাজনীতিতে সমালোচনা থাকবে, মতবিরোধ থাকবে, প্রশ্ন থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল। ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপপ্রচার কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশকে বিষাক্ত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ও বিবেকনির্ভর সমর্থনের আহ্বান

মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত বলেন, “সমালোচনা হোক তথ্যভিত্তিক, সমর্থন হোক বিবেকের তাগিদে এবং সিদ্ধান্ত হোক দেশের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে।” নাগরিকদেরও রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; বরং তাদের কর্মকাণ্ড, নীতি, সততা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণে ভূমিকা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, একটি সচেতন জনগোষ্ঠীই পারে রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে। নাগরিকদের দায়িত্ব শুধু ভোট দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক মত প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের আইন-কানুন মেনে চলা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়াও নাগরিক দায়িত্বের অংশ।

নেতৃত্বের পরিচয় হোক সততা ও জনসেবা

মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যাদের পরিচয় হবে তাকওয়া, সততা, জবাবদিহি ও জনসেবার মাধ্যমে। নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং এটি জনগণের আমানত ও দায়িত্ব।

তিনি বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক নেতা কতটা জনপ্রিয়—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কতটা সৎ, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং মানুষের প্রয়োজনে কতটা পাশে দাঁড়ান। ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু মানুষের জন্য করা কল্যাণমূলক কাজ দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকে।

তিনি আরও বলেন, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী অপরাধ করলে তার বিচার হতে হবে আইনের মাধ্যমে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে, সেদিকে রাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র ও আইনব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়ে। অন্যদিকে বিচারহীনতা কিংবা পক্ষপাতমূলক আচরণ সমাজে হতাশা ও বিভাজন সৃষ্টি করে। তাই অপরাধের বিচার হবে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে—এটাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা

মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে এবং ভিন্নমতের মানুষও পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ না হয়; বরং যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে।

তিনি বলেন, “মতের ভিন্নতা রাজনীতির সৌন্দর্য—শত্রুতা নয়।” তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি প্রত্যাশা

দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। আবেগের পরিবর্তে তথ্য, যুক্তি ও বিবেককে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখেই যাচাই-বাছাই ছাড়া তা ছড়িয়ে না দিয়ে সত্যতা যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম যদি দায়িত্বশীল, মানবিক ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

কল্যাণরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখার আহ্বান

মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত বলেন, আমাদের প্রত্যাশা এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে নেতৃত্বের মূল্যায়ন হবে তার সততা, তাকওয়া, দক্ষতা, জবাবদিহি ও জনসেবার মাধ্যমে। আর নাগরিকের পরিচয় হবে সচেতনতা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ যেন তার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে—এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত সবার সম্মিলিত লক্ষ্য। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু দেশের প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

সবশেষে তিনি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের মাধ্যম, নেতৃত্ব হবে আমানতদারির প্রতীক, রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবে জবাবদিহি, আর নাগরিক সমাজে থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ।

“আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি—যেখানে নেতৃত্বের পরিচয় হবে তাকওয়া, সততা, জবাবদিহি ও জনসেবায়; আর নাগরিকের পরিচয় হবে সচেতনতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধে।”