নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, “একজন মা শিক্ষিত হলে তিনি শুধু একটি পরিবারকে নয়, একটি প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তুলতে পারেন। আর শিক্ষিত প্রজন্মই পারে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতি গড়ে তুলতে।”

 

তিনি বলেন, শিক্ষার প্রসারে পরিবারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। মেধা ও প্রতিভার বিকাশের সুযোগ পেলে নারীরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

 

শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টায় বদরগঞ্জ উপজেলা অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের বদরগঞ্জ উপজেলা শাখার উদ্যোগে এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি এটিএম আজহারুল ইসলাম কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে তাদের সাফল্যের পেছনে যেসব শিক্ষক ও অভিভাবক সময়, শ্রম ও সহযোগিতা দিয়েছেন, তাদের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

‘শিক্ষিত মা-ই পারে শিক্ষিত জাতি গড়তে’

 

শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, নেপোলিয়নের সেই বিখ্যাত বক্তব্য—‘তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব’—এর মধ্যে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের গভীর সত্য নিহিত রয়েছে। কারণ একটি শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষাগুরু তার মা। মা যদি শিক্ষিত, সচেতন ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন হন, তাহলে সন্তানের মধ্যেও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও ভালো মূল্যবোধ তৈরি হয়।

 

তিনি উপস্থিত মায়েদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা আপনাদের মেয়েদের পড়ালেখার সুযোগ দেবেন। তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ করে দেবেন। তারা যেন নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অবদান রাখতে পারে—সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”

 

জিপিএ-৫ জীবনের শেষ নয়, মাত্র শুরু’

 

জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এই ফলাফল শিক্ষার্থীদের জীবনের চূড়ান্ত অর্জন নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের দীর্ঘ পথচলার প্রথম ধাপ।

 

তিনি বলেন, “তোমরা যারা জিপিএ-৫ পেয়েছো, এটা তোমাদের মাত্র শুরু। একটি ফুলের কলি ফুটেছে। শুধু কলি দেখেই মেধাবী বলা যাবে না; শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। এসএসসির পর যদি সেই মেধার বিকাশ থেমে যায়, তাহলে এই অর্জন কোনো কাজে আসবে না।”

 

তিনি আরও বলেন, শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেই একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থে মেধাবী হয়ে ওঠে না। জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে একজন মানুষকে গড়ে উঠতে হবে। কর্মজীবনে নিজের মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখতে পারলেই সেই মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।

 

শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর আহ্বান

 

এ অঞ্চলের শিক্ষার চিত্র তুলে ধরে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার হার এখনো তুলনামূলকভাবে কম। অনেকের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহও কম রয়েছে।

 

তিনি বলেন, অনেক পরিবার এখনো মনে করে, জমি-জমা আছে, চাষাবাদ করলেই কোনোভাবে জীবন চলে যাবে; অত বেশি অর্থ-সম্পদের প্রয়োজন কী। এ ধরনের চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি তাদের দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

 

শিক্ষকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান

 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, এমন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি। তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান থাকার উদ্দেশ্য কী—এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করতে হবে।

 

শিক্ষকেরা যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কি না এবং শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হচ্ছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

 

শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনি প্রতি মাসে সরকারের কাছ থেকে বেতন পাচ্ছেন। সেই বেতনের হক আদায় করছেন কি না, দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন কি না—সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে না হলেও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।”

 

তিনি শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো মনে করে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠদান করার আহ্বান জানান।

 

শিক্ষক প্রশিক্ষণ আরও কার্যকর করার আহ্বান

 

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা আরও কার্যকর ও জোরদার করতে হবে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যথাযথ প্রশিক্ষণ পেলে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের আরও ভালোভাবে পাঠদান করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে সন্তানদের রক্ষায় সতর্ক থাকার আহ্বান

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এর অপব্যবহার তাদের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সন্তানরা প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

 

নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্ব

 

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি পিতা-মাতা ও শিক্ষকদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হবে। নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্রবান মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।

 

তিনি বলেন, শুধু ভালো ফলাফল নয়, একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার চরিত্র, সততা, নৈতিকতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের ওপর।

দল-মত নির্বিশেষে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই’

নিজের জন্য দোয়া চেয়ে এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, তিনি দল-মত নির্বিশেষে দেশ, জনগণ ও এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতে চান।

 

তিনি বলেন, “আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমি ওয়াদা করেছি—দেশ, জনগণ ও এলাকার জন্য কাজ করব। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী যেহেতু একটি ইসলামী দল, ইসলামের জন্যও কাজ করব। এই দুটি কাজ আমি সততার সঙ্গে করতে চাই।”

 

সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার যে বরাদ্দ দেবে, তা যাকে এবং যেখানে দেওয়ার কথা সরকার নির্ধারণ করবে, সেখানেই পৌঁছে দেওয়া হবে। সরকারি অর্থের কোনো অপব্যবহার হবে না বলেও তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “একটি টাকাও আমার পেটে ঢুকবে না, ইনশাআল্লাহ।”

 

১০০ শিক্ষার্থী পেলেন সংবর্ধনা

 

বদরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ আল আমানের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি জাকারিয়া আল হোসাইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বদরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা কামরুজ্জামান কবির, নায়েবে আমীর শাহ মুহাম্মাদ রুস্তম আলী, সেক্রেটারি মাওলানা মিনহাজুল ইসলাম, জেলা সভাপতি হামিদুর রহমান, রংপুর মহানগর ছাত্রশিবিরের সাবেক আইন সম্পাদক আল আমিন কবিরসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দু। অনুষ্ঠানে এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১০০ শিক্ষার্থীকে উপহার ও শুভেচ্ছা স্মারক ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

 

ফ্রি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিদর্শন

 

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আগে সকালে বদরগঞ্জ স্টেশন রোডে ইসলামী পাঠাগার ও সমাজকল্যাণ সংস্থার কার্যালয়ে তাঁর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সাপ্তাহিক ফ্রি চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। এ সময় তিনি চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেন। রোগীদের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন তিনি।শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম।