রংপুর ব্যুরো: আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ)
রংপুরের বদরগঞ্জে মাদক বিস্তারকে কেন্দ্র করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকারকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বদরগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি কমল লোহানী। প্রকাশ্য ফুটবল খেলার এক অনুষ্ঠানে তিনি ওসিকে ‘মাদকের ডিলার’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই এলাকায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে। তবে বিএনপি নেতার এমন অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ওসি হাসান জাহিদ সরকার। তাঁর দাবি, পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং এ বিষয়ে তাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। গত ১৮ অক্টোবর বদরগঞ্জের জামুবাড়ী পকিহানা রেলগেট খেলার মাঠে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মিনিবার ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে কমল লোহানী এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের পর মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা এবং ওসির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পৌর বিএনপির সভাপতি কমল লোহানী বলেন, বদরগঞ্জে মাদকের বিস্তার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বর্তমান থানার ওসি মাদকের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন এবং তাঁর কারণেই এলাকায় মাদকের ছড়াছড়ি বেড়ে গেছে। বক্তব্যে তিনি ওসিকে সরাসরি ‘মাদকের ডিলার’ বলেও আখ্যায়িত করেন।
পৌর বিএনপি সভাপতির এমন মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বদরগঞ্জ থানার ওসি হাসান জাহিদ সরকার বলেন, রাজনৈতিক নেতারা কে কী বলবেন, সেটি তাঁদের নিজস্ব বিষয়। তবে পুলিশ তার দায়িত্বের জায়গা থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ওসি বলেন, “আমরা আমাদের জায়গা থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সোচ্চার আছি। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। বর্তমান সময়ে মাদকের পক্ষে থাকার কোনো সুযোগ আছে কি?” তিনি আরও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। সেই নীতির আলোকে পুলিশও মাদক নির্মূলে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অবস্থান নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি থাকা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কমল লোহানীর বক্তব্যের পেছনে একটি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভায় তাঁকে আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন ওসি হাসান জাহিদ সরকার। এ বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, দুর্গাপূজা শুরুর আগে উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মোট ১২৫টি পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে থানায় আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভা করা হয়েছিল। ওসির ভাষ্য, পূজামণ্ডপগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানোর উদ্দেশ্যেই ওই সভার আয়োজন করা হয়। বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা হওয়ায় তাঁকে পূজামণ্ডপ কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এটি কোনো রাজনৈতিক সভা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। ওসি বলেন, পরিতোষ চক্রবর্তী থানায় আসার সময় তাঁর সঙ্গে কয়েকজন নেতাকর্মীও উপস্থিত হন। একপর্যায়ে তিনি পরিতোষ চক্রবর্তীর কাছে জানতে চান, নেতাকর্মীরা কেন তাঁর সঙ্গে এসেছেন। জবাবে পরিতোষ চক্রবর্তী বলেন আসছে যেহেতু বসুক পিছনে। ওসি আরও জানান, ওই সময় বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক ব্যক্তিগত কাজে থানায় আসেন। পরে পরিতোষ চক্রবর্তী তাঁকে পূজামণ্ডপের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে বলেন। ওসির দাবি, এটি ছিল সম্পূর্ণ আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক আলোচনা, কোনো রাজনৈতিক বৈঠক নয়। তিনি বলেন, “কমল লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে তো আমার ভালো সম্পর্ক। তাঁকে ওই সভায় না ডাকায় হয়তো তিনি ভুল বুঝে এমন মন্তব্য করতে পারেন।”
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি কমল লোহানীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আরও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন, তিনি বলেন এই ওসি টাকা হলে সব করেন, বদরগঞ্জে মাদক, জুয়া, অবৈধ বালু উত্তোলন সবগুলো সঙ্গে জড়িত এই ওসি। তিনি সন্ধ্যা হলে এবং রাত গভীর হলে সবগুলো বালু পয়েন্ট থেকে বালু খেকোদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নেয় প্রতিদিন তার বিনিময়ে বালুর পয়েন্ট চলতে দেন তিনি। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন জায়গায় জুয়া চালানোর পার্মিশনও দিয়েছেন তার বিনিময়ে প্রতিদিন নেন অর্থ। এছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে গ্রেপ্তার না করে টাকার বিনিময় তাদেরকে সেলটার দিচ্ছেন। বদরগঞ্জ টা যেহেতু আমাদের আমাদের সন্তানদের বিষয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে বদরগঞ্জের মানুষকে নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে। এই ওসি এখানে থাকলে বালু মহল কখনো বন্ধ হবে না। এবং মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদেরকে মাদক চালানোর পারমিশন দিচ্ছেন। এই ওসি এখানে থাকুক আমরা বদরগঞ্জবাসী চাইনা এই ওসির দ্রুত অপসারণ চাই।
বদরগঞ্জে মাদকের বিস্তার নিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতার এমন প্রকাশ্য অভিযোগ এবং থানার ওসির পাল্টা বক্তব্য স্থানীয় পর্যায়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বক্তব্যের বাইরে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ যাচাই, প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান। মাদক সমাজ, পরিবার ও তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। তাই বদরগঞ্জে মাদক ব্যবসা ও বিস্তার রোধে কার্যকর অভিযান, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহলের অনেকে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মিনিবার ফুটবল টুর্নামেন্টের ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বদরগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম রসুল বকুল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার লোহানী ভুট্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার খোকন কুমার দাশসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা।