সুমন হোসেন প্রতিনিধি:
যশােরের মণিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের কৃষক শুভংকর বৈরাগী (৪০)। প্রতিবছর বর্ষাকালে বাড়িতে পানি ওঠে। গত বর্ষা মৌসুমেও তাঁর বাড়িতে হাঁটু সমান পানি উঠেছিলো। প্রায় চার মাস পর বাড়ির পানি নেমে গেছে। তবে বাড়ি সংলগ্ন বিল কেদারিয়া ভরে আছে পানিতে। ওই বিলে শুভংকরের জমি আছে দুই বিঘা (৫২ শতকে ১ বিঘা)। শুভংকোর বৈরাগী বলেন, জমিতে এখনাে বুকসমান জল। বিল থেকে জল নামছে না। এবারও এক শতক জমিতেও বােরাে চাষ করতে পারলাম না। যশােরের ভবদহ অঞ্চলের বেশির ভাগ বিল ভরে আছে গত বর্ষার পানিতে। বিলের কােথাও কােমরসমান আবার কােথাও বুকসমান পানি। বিলের জমিতে শুভংকোর বৈরাগীর মতাে বেশির ভাগ কৃষক এবারও বােরাে ধানের চাষ করতে পারেননি।
যশােরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ অঞ্চল হিসেবে ধধিক পরিচিত। ভবদহ অঞ্চলে ৫২টি ছােট-বড় বিল আছে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদীর জােয়ার-ভাটার সঙ্গে এসব বিলের পানি ওঠানামা করে। কি পরিমান পলি পড়ায় নদীগুলাে নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে এসব নদী দিয়ে এখনো ঠিকমতাে পানি নিষ্কাশন হয় না। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে এলাকার বিলগুলাে প্লাবিত হয়। বিল উপচে পানি ঢােকে বিলসংলগ্ন গ্রামগুলােয়। সর্বশেষ গত বছরের জুলাই ও আগস্টে অতিবর্ষণ হওয়ার জন্য অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার দেড় শতাধিক গ্রামের বেশির ভাগ ঘরবাড়ি, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট এবং মাছের ঘের পানিতে প্লাবিত হয়। পানিবন্দী হয়ে দুর্ভােগে পড়েন দুই লাখের বেশি মানুষ। এরপর ভবদহ শ্রী ও হরি নদ-নদীতে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে পাইলট (পরীক্ষামূলক) চ্যানেল কাটার কাজ শুরু করেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বাের্ড। একপর্যায়ে বাড়িঘর থেকে পানি নেমে যায়। কি এখনাে এ অঞ্চলের বেশির ভাগ বিল পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত বােরাে মৌসুম। বােরাের বীজতলা তৈরির সময় ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত। বােরাে ধানের চারা রােপণের সময় ১ থেকে ৩১ জানুয়ারি। ২০ ফব্রুয়ারি পর্যন্ত ধানের চারা রােপণ করা হয়। মনিরামপুর উপজলার কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ উপজলায় ১২ হাজার ১শ” ৪ হেক্টর জমি আছে। এর মধ্য ৩ হাজার ৮শ” ২৩ হেক্টর জমিতে বােরাে আবাদ হয়নি।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহবায়ক গাজী আব্দুল হামিদ বলেন, কৃষি অফিস ভবদহ অঞ্চলের কৃষিজমি এবং জলাবদ্ধ কৃষি জমির যেসব তথ্য দিয়েছে তা পুরােপুরি সঠিক নয়, বাস্তব আরও বেশি হবে। গত এক সপ্তাহ ভবদহ অঞ্চলের ৫টি বিল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিলগুলাে ভরে আছে পানিতে। বিল বােকড়, বিল কেদারিয়া, বিল কপালিয়া, বিল জিয়ালদহ ও বিল পায়রায় শুধু পানি আর পানি। কােনায় কােনায় বিলের ওপরের অংশ চারদিকে বাঁধ দিয়ে সেচের মাধ্যমে বােরাে ধানের চাষ করা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ বিল কোথাও ধানখেত নেই। বিলের পানিতে ভাসছে কিছু আগাছা, কচুরিপানা আর শাপলা। হরিদাসকাটি ইউনিয়নের নেবুগাতী গ্রামের কৃষক বিমল রায়ের (৬৮) বিল বােকড়ে জমি আছে ৯ বিঘা (৪২ শতকে ১ বিঘা)। এর মধ্য বিলের একটি মাছের ঘেরের মধ্যে তাঁর জমি আছে তিন বিঘা। সেচ যন্ত্র দিয়ে সেচে তিনি এর মধ্যে দেড় বিঘা জমিতে বােরাে ধানের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বিল বােকড়ে মুক্তেশ্বরী নদীর এক পাশে আমার ৬ বিঘা জমি আছে। ওই জমিতে এখনাে ৫ থেকে ৭ ফুট জল। সেখানে বােরাে ধান চাষ সম্ভব না। নদীর অপর পাশে তিন বিঘা জমি আছে। জল অনেকটা কম থাকায় জল সেচ এর মধ্যে দেড় বিঘা জমিতে বােরাে ধান করেছি। বিল ডুমুরে ১৫ বিঘা (৫২ শতকে ১ বিঘা) জমি আছে মনিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক অসীম ধরের (৬৪)। ওই জমিতে বুকসমান পানি রয়েছে। এবার সেচ যন্ত্র দিয়ে পানি সেচে তিনি আট বিঘা জমিতে বােরাে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বিলের ওপরের অংশ জল কম ছিলো। সেচযন্ত্র দিয়ে সেচে আট বিঘা জমিতে বােরাে ধানের চাষ করেছি। নিচের জমিতে অনেক জল। সেচের মতাে অবস্থা নেই। ওই জমিতে ধান লাগানাে সম্ভব হয়নি। ভবদহ এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য নদী পুনঃখনেনর কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বাের্ড যশােরের কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী। তিনি বলেন, নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে সেচে নদী শুকিয়ে পুনঃখনেনর কাজ করা হচ্ছে। এলাকার বিলগুলােয় বােরাে আবাদের জন্য তিনবার পিছিয়ে গত ১ জানুয়ারি নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইচগেটের ১২টি গেট খােলা ছিলো। এ জন্য নদীতে বাঁধ দেওয়ার আগেই এলাকার বেশির ভাগ পানি দ্রুত নেমে গেছে। এ জন্য এলাকার বিলগুলােয় গত বছরের চেয়ে এবার বেশি জমিতে বােরা ধানের চাষ হয়েছে।