রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুরে সরকারি সার চোরাচালান ও অবৈধ বেচাকেনার অভিযোগে আলোচিত ঘটনার তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে উপ-সহকারী স্টোর কিপার জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও কথিত বিশেষ সহকারী আশরাফুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রংপুর নগরীর কেল্লাবন ও কালীবাড়ি এলাকার বিএডিসির সার গুদামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী স্টোর কিপার জিয়াউর রহমানের একান্ত সহযোগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছিলেন আশরাফুল ইসলাম। যদিও সরকারি দপ্তর বিএডিসির সার গুদামে তার নামে কোনো ধরনের নিয়োগপত্র বা অফিসিয়াল কাগজপত্র নেই। তবুও তিনি দীর্ঘদিন ধরে গুদাম এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গুদামে সার ওঠানামা, ট্রাক লোডিং, ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের বেশিরভাগ বিষয়েই আশরাফুল ইসলামের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে তাকে গুদামের অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপক হিসেবেও দেখা যেত বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরশুরাম থানার তদন্ত কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রাথমিক তদন্তে আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে চোরাই সার ক্রয়-বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, “ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার জন্য তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।”
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি গোপন সূত্র দাবি করেছে, স্টোর কিপার জিয়াউর রহমান তার এই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর মাধ্যমেই সার সরবরাহ সংক্রান্ত বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন এবং বেচাকেনার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি গুদাম থেকে বের হওয়া সারের একটি অংশ বিভিন্ন সময়ে অবৈধভাবে বাইরে পাচার করে বাজারে বিক্রি করা হতো।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জানুয়ারি রাত প্রায় ৯টার দিকে পরশুরাম থানার সামনে একটি সন্দেহভাজন ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ট্রাক চালক মানিক মিয়ার কাছে সার পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র চাইলে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন। পরে ট্রাকটি তল্লাশি করে পুলিশ ১৩৪ বস্তা টিএসপি সার, ৫০ বস্তা ডিএপি সার এবং ৩০ বস্তা এমওপি সারসহ মোট ২১৪ বস্তা সার উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া এসব সারের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় নগরীর তাজহাট কেডিসি রোড এলাকার সুলতান নগরের বাসিন্দা খবির উদ্দিনের ছেলে ট্রাক চালক মানিক মিয়াকে আটক করা হয়। পরে পুলিশ বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে এবং ট্রাকটি জব্দ করা হয়।
ঘটনার পর সার গুদামে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই দিনই নগরীর বিএডিসি কালীবাড়ি সার গুদাম থেকে গঙ্গাচড়া উপজেলার এক ডিলার রাকিবুল ইসলামের কাছে ৭৩৮ বস্তা সার পাঠানো হয়েছিল। গুদামের ইনচার্জ ও বিএডিসির উপ-সহকারী পরিচালক জিয়াউর রহমান দাবি করেন, ডিলার রাকিবুল ইসলাম ওই সার বুঝে পেয়েছেন এবং গুদামের হিসাবেও তা উল্লেখ রয়েছে।
তবে তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধার হওয়া সার এবং গুদাম থেকে সরবরাহ করা সারের হিসাবের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সারের চালান, ডিলারদের বিল-ভাউচার এবং পরিবহন সংক্রান্ত কাগজপত্রও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, এ ঘটনাকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে কি না তাও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি গুদাম থেকে সার বের হওয়ার প্রক্রিয়া, ডিলারদের কাছে সরবরাহ এবং পরিবহনের প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে চোরাই সার কাণ্ডে নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।