রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুর মহানগরীতে পারিবারিক বিরোধের জেরে শ্বশুরের হামলায় মোছাঃ রুবাইয়াত জাহান (২১) নামে এক গৃহবধূ গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শ্বশুর লিয়াকত আলী খান (৫৫)-কে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১১ জুন পারিবারিকভাবে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী রেজিস্ট্রি কাবিনের মাধ্যমে রুবাইয়াত জাহানের সঙ্গে খান মোহাম্মদ লাব্বাইক (৩০)-এর বিয়ে হয়। বিয়ের পরপরই তার শ্বশুরবাড়িতে অশান্তির সূচনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শাশুড়ি লাভলী বেগম ও ননদ লুতফিয়াতুজ জান্নাত সুম্মা গায়ের রং নিয়ে কটূক্তি, অপমান এবং মানসিক নির্যাতন চালাতেন। একই সঙ্গে যৌতুকের জন্য চাপ প্রয়োগও চলতে থাকে।
পরবর্তীতে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় বসবাসের সময় নির্যাতনের মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, শাশুড়ি ও ননদের প্ররোচনায় স্বামী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর চেষ্টা, পরকীয়ার অভিযোগ তুলে অপমান করা এবং বাসায় আটকে রেখে নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে স্বামী ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন এবং তা না দিলে সংসার টিকবে না বলে হুমকি দেন।
পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে রুবাইয়াতকে রংপুরে এনে স্বামী, শাশুড়ি ও ননদ মিলে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় গত ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে কোতয়ালী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী। মামলায় স্বামী, শাশুড়ি ও ননদকে আসামি করা হলেও তারা এখনো পলাতক রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৪ এপ্রিল নতুন করে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, মামলায় নাম না থাকায় শ্বশুর লিয়াকত আলী খান বাড়িতে অবস্থান করছিলেন এবং পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে রুবাইয়াত শ্বশুরবাড়িতে গেলে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে লিয়াকত আলী ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন। আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে রুবাইয়াতের ডান হাতের কনুইয়ের ওপর গুরুতর জখম হয়।
ঘটনার পর অভিযুক্ত পক্ষ জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে ‘বাড়িতে হামলা’ হয়েছে বলে মিথ্যা তথ্য দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তেমন কোনো ঘটনার সত্যতা না পেয়ে উভয় পক্ষকে থানায় নিয়ে আসে। পরে থানায় অবস্থানকালে রুবাইয়াতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তার আঘাতের বিষয়টি স্পষ্ট হয় এবং দ্রুত তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা নূর-ই-রাব্বী (৪৩) বাদী হয়ে একই দিন কোতয়ালী থানায় শ্বশুর লিয়াকত আলী খানকে প্রধান আসামি করে পৃথক একটি মামলা দায়ের করেন।
কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজাদ রহমান জানান, “ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা রুজু করা হয়েছে। অভিযুক্ত লিয়াকত আলী খানকে ১৫ এপ্রিল গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।”
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই পরিকল্পিতভাবে রুবাইয়াতের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এ ধরনের পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতন সমাজে উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।