রংপুর ব্যুরো: আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ)
রংপুরের পীরগঞ্জে পবিত্র কোরআন শরিফ ও ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মূল অভিযুক্ত সৌরভ চন্দ্র মহন্তকে (১৯) গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত ৩টা ১০ মিনিটে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক বেলাই গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট ও ভিডিওকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার জেরে অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের বাড়িঘরে ভাঙচুর, আসবাবপত্র তছনছ ও দুটি টেলিভিশন ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া তিনটি খাসির বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি। রংপুর জেলা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গ্রেপ্তার সৌরভ চন্দ্র মহন্ত পীরগঞ্জ উপজেলার চককরিম কাশিমপুর গ্রামের বিশু মহন্তের ছেলে। রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের দিকনির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সৌরভের টিকটক ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পবিত্র কোরআন শরিফ ও ইসলাম ধর্ম অবমাননাকর একটি আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের অভিযোগ ওঠে। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চক করিম তেলিপাড়া গ্রামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উত্তেজিত লোকজন সৌরভের পরিবারের সদস্যদের বাড়িসহ তিনটি ঘরের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন। ঘরের ভেতরে ঢুকে আসবাবপত্র ও অন্যান্য মালামাল তছনছ করা হয়। এ সময় দুটি টেলিভিশন ভাঙচুরের পাশাপাশি রান্নাঘর ও অন্যান্য স্থাপনারও ক্ষতি করা হয়। ঘটনার সময় তিনটি খাসির বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সৌরভ গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। প্রায় দুই মাস আগে টিকটক ও ফেসবুকে পবিত্র কোরআন শরিফ ও আল্লাহকে নিয়ে গালিগালাজপূর্ণ একটি পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে উত্তেজনা ও ঝামেলার সৃষ্টি হলে তিনি গ্রামের বাড়ি পীরগঞ্জের চক করিম তেলিপাড়ায় ফিরে আসেন। পরে পোস্টটি মুছে ফেলার পাশাপাশি নিজের ফেসবুক পেজও নিষ্ক্রিয় করে দেন বলে জানা গেছে।
পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক জানান, দুর্গাপূজার সপ্তমীর দিনে আগের পোস্টের বিষয়বস্তু কপি করে কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শর্টস ও রিঅ্যাকশন ভিডিও আকারে ছড়িয়ে দেন। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে সৌরভের বাবার বাড়িতে হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে পুলিশের কাছে খবর আসে। ওসি বলেন, হামলার আশঙ্কার খবর পেয়ে পুলিশ বিকেলেই ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় ব্যক্তিরা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না বলে আশ্বস্ত করলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চারজন পুলিশ সদস্যকে সাদাপোশাকে এবং কয়েকজন সোর্সকে সেখানে রাখা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হওয়ায় তাঁদের ফিরে আসতে বলা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সৌরভ চন্দ্র মহন্তের পাশাপাশি দীনেশ চন্দ্র মহন্ত ও জগদিশ চন্দ্র মহন্তের বাড়িতেও ভাঙচুর চালানো হয়। ঘরের টিনের বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। ভেতরে থাকা জিনিসপত্র এলোমেলো করে দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের দাবি, হঠাৎ একদল লোক এসে এ ভাঙচুর চালায়। তবে অন্ধকার থাকায় তাঁদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত জগদিশ চন্দ্র মহন্ত বলেন, “সন্ধ্যার পর রাস্তায় অনেক লোক ছিল। কয়েকজন বাধা দিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের বাধা দিতে দেওয়া হয়নি। আমার রান্নাঘর ও ছাগলের ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। হঠাৎ ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ এসে ভাঙচুর চালান। বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁদের চিনতে পারিনি।” অপর ক্ষতিগ্রস্ত দীনেশ চন্দ্র মহন্ত বলেন, তাঁর ঘরের সব জিনিস এলোমেলো করে ভাঙচুর করা হয়েছে। টেলিভিশন ও বেড়ার টিন ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর তিনটি খাসির বাচ্চা নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে বাড়িঘর সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন ওসি নাজমুল হক। তাঁর ভাষ্য, সৌরভসহ আরও দুজনের বাড়িতে তিনটি ঘর ও তিনটি রান্নাঘর রয়েছে। ঘরগুলো পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়নি; টিনের বেড়ায় আঘাত করায় সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুটি টেলিভিশন ভাঙচুর এবং অন্যান্য মালামাল এলোমেলো করার তথ্য পাওয়া গেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে সোমবার রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রংপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, “কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর করতে পারেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কোনো ঘটনা ঘটলেও তার আইনগত প্রতিকার রয়েছে। আবার এর জেরে কারও বাড়িঘরে হামলা বা ভাঙচুর করাও আইনবিরুদ্ধ। উভয় বিষয়ই আমরা আইনের আওতায় আনব।” পুলিশ জানিয়েছে, বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রাথমিক তদন্ত চলছে। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সৌরভকে গ্রেপ্তার করা হলেও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় ২৭ অক্টোবর পীরগঞ্জ থানায় মামলা করা হয়েছে। থানার মামলা নং ৩০। মামলায় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৫৩, ১৫৩এ, ২৯৫এ ও ২৯৮ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর সৌরভকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।