রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুরে চোরাই সার আটক হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের কাছে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে ট্রাকচালকের পরিবারকে ৪ লাখ টাকা এবং একটি নতুন ট্রাক কিনে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর উপ-সহকারী (স্টোরকিপার) জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তুলেছেন আটক ট্রাকচালক মানিক মিয়ার পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের দাবি, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে ট্রাকচালক মানিক মিয়াকে মামলায় জড়িয়ে জেল খাটানো হচ্ছে। তারা বলছেন, মানিক মিয়া একজন ভাড়াভিত্তিক পেশাদার ট্রাকচালক, যিনি বিভিন্ন ব্যবসায়ীর পণ্য পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু লেবার সরদার কালু, স্টোরকিপার জিয়াউর রহমান এবং এক ডিলার মমদেলের যোগসাজশে চোরাইভাবে সার বিক্রির ঘটনায় তাকে অন্যায়ভাবে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সার বিক্রির বিষয়ে মানিক মিয়ার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তিনি কেবল ভাড়ার ভিত্তিতে ট্রাক চালিয়ে পণ্য পরিবহন করছিলেন। এরপরও তাকে আটক করে রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং বর্তমানে তিনি জেল হাজতে রয়েছেন। অথচ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিরা এখনও আইনের আওতার বাইরে রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। আটক ট্রাকচালক মানিক মিয়ার ছেলে রাশেদ বলেন, স্টোরকিপার জিয়াউর রহমান আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বলেন। তিনি বলেন, ‘এই সার কার তা আমি জানি না’ এমন কথা বললেই আমার বাবাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, আমাদের ৪ লাখ টাকা এবং একটি নতুন ট্রাক কিনে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন। কিন্তু আমরা ন্যায়ের পথে থাকার জন্য সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি।”
রাশেদ আরও দাবি করেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কল রেকর্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ রয়েছে। প্রয়োজনে সেসব প্রমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। তার অভিযোগ, স্টোরকিপার জিয়াউর রহমান, লেবার সরদার কালু এবং ডিলার মমদেল মিলে গঙ্গাচড়া উপজেলার সুমন নামের এক ব্যক্তির কাছে অবৈধভাবে সার বিক্রি করেছিলেন।এদিকে মানিক মিয়ার স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,আমার স্বামীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তিনি আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। আমি ছেলে সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। সামনে ঈদ—কিন্তু আমাদের ঘরে কোনো আনন্দ নেই। অনেকদিন ধরে আমার স্বামী জেল হাজতে আছেন এবং তাকে রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। অথচ প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। একই অভিযোগ করেন মানিক মিয়ার ছোট ভাই এবং তার মেয়ের জামাই রুজু। তিনি বলেন, “স্টোরকিপার জিয়াউর রহমান আমাদের মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বলেছিলেন। কিন্তু আমরা তাতে রাজি হইনি। এরপর পরিকল্পিতভাবে প্রশাসনকে প্রভাবিত করে আমার ভাইকে জেল খাটতে বাধ্য করা হচ্ছে। কল ট্র্যাকিং করলেই প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব।” তিনি আরও বলেন, যারা প্রকৃতপক্ষে অবৈধভাবে সার বিক্রির সঙ্গে জড়িত তাদের এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-সহকারী (স্টোরকিপার) জিয়াউর রহমান সাংবাদিকদের উল্টো মামলা করার হুমকি দেন। তিনি বলেন, “আমি যা খুশি তাই করব, সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আপনারা আমাকে ডিস্টার্ব করছেন। আমি আপনাদের নামে মামলা করতে যাচ্ছি।”
এদিকে গত সোমবার রাতে পুলিশ জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত আশরাফুল ইসলামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে জিয়াউর রহমান দাবি করেন, আশরাফুল ইসলাম তার কোনো সহযোগী নন। তবে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আশরাফুল ইসলাম স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে আড়ালে সার বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। বিএডিসির একজন ডিলার ফিরোজ আলম জানান, স্টোরকিপার জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই কালোবাজারে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন,
“ডিলাররা সার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রায়ই খারাপ ব্যবহার করেন। এছাড়াও অনেক তথ্য পাওয়া গেছে যে তিনি সার কালোবাজারে বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জানুয়ারি রাত প্রায় ৯টার দিকে পরশুরাম থানার সামনে সন্দেহভাজন একটি ট্রাক আটক করে পুলিশ। এ সময় ট্রাকচালক মানিক মিয়ার কাছে সার পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। পরে ট্রাকটি তল্লাশি করে পুলিশ ১৩৪ বস্তা টিএসপি, ৫০ বস্তা ডিএপি এবং ৩০ বস্তা এমওপি সারসহ মোট ২১৪ বস্তা সার উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া সারগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এ ঘটনায় নগরীর তাজহাট কেডিসি রোডের সুলতান নগর এলাকার খবির উদ্দিনের ছেলে ট্রাকচালক মানিক মিয়াকে আটক করা হয় এবং পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ওইদিন নগরীর বিএডিসি কালীবাড়ি সার গুদাম থেকে গঙ্গাচড়া উপজেলার ডিলার রাকিবুল ইসলামের কাছে ৭৩৮ বস্তা সার পাঠানো হয়েছিল। গুদামের ইনচার্জ ও বিএডিসির উপ-সহকারী পরিচালক জিয়াউর রহমান দাবি করেন, ডিলার রাকিবুল ইসলাম সার বুঝে পেয়েছেন। এ বিষয়ে পরশুরাম থানার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার হওয়া সার এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে। এদিকে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে চোরাই সার সিন্ডিকেটের পুরো চিত্র সামনে আসতে পারে এবং প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তির আওতায় আসবে।