নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা মানুষকে শুধু নতুন সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচয় করায় না, বরং নিজের দেশ ও সমাজকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগও করে দেয়। এমনই অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে মন্তব্য করেছেন রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ নম্বর লোহনীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রায়হান কবির মিল্টন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে তিনি বিদেশের জীবনযাত্রার সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক পরিবেশের তুলনা তুলে ধরে বলেন, উন্নত সমাজের মূল শক্তি শুধু অর্থনীতি বা প্রযুক্তি নয়, বরং মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, নিজের কাজে মনোযোগ, আইনের প্রতি সম্মান এবং মানবিক মূল্যবোধই একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, বিদেশে থাকাকালে তিনি লক্ষ্য করেছেন, অধিকাংশ মানুষ নিজের কাজ, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ চাকরি করছেন, কেউ আবার নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অহেতুক আলোচনা, সমালোচনা কিংবা হিংসাত্মক মানসিকতার চর্চা সেখানে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তার ভাষায়, এই ইতিবাচক সামাজিক সংস্কৃতির কারণেই মানুষ মানসিকভাবে অনেক বেশি শান্তিতে থাকে। তারা জানে, নিজের পরিশ্রমই জীবনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। অন্যকে ছোট করে নয়, বরং নিজের যোগ্যতা দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই সেখানে সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি মূল্যবোধ।
রায়হান কবির মিল্টন বলেন, “আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অনেক সময় বিদেশে আমি যতটা নিরাপদ অনুভব করি, নিজের দেশে ততটা করি না। এটি কোনোভাবেই আমার দেশকে ছোট করার জন্য বলা নয়। আমি এই দেশেরই সন্তান। দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমাদের সমাজের কিছু বাস্তবতা নিয়ে কথা বলছি, যাতে আমরা নিজেদের ভুলগুলো বুঝতে পারি এবং সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করি। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সমাজে এখনও হিংসা, বিদ্বেষ, অকারণ সমালোচনা এবং একে অপরকে টেনে নামানোর প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পর্ক—অনেক জায়গাতেই ইতিবাচক চিন্তার পরিবর্তে নেতিবাচকতা বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
তার মতে, অনেক মানুষ নিজের উন্নতির পরিকল্পনা করার পরিবর্তে অন্যের ব্যর্থতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে ব্যক্তিগত উন্নয়ন যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি সমাজেও পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একটি জাতির অগ্রগতির জন্য এমন মানসিকতা কখনোই সহায়ক হতে পারে না। তিনি বলেন, উন্নত সমাজ গঠনের জন্য প্রত্যেক মানুষকে আত্মসমালোচনার পাশাপাশি আত্মউন্নয়নের পথ বেছে নিতে হবে। শিক্ষা, দক্ষতা, পরিশ্রম, সততা এবং নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। অন্যকে হেয় করে নয়, বরং নিজের যোগ্যতার মাধ্যমে সম্মান অর্জনই হওয়া উচিত প্রত্যেক মানুষের লক্ষ্য।
রাজনীতি প্রসঙ্গে রায়হান কবির মিল্টন বলেন, রাজনীতি একটি দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু যদি সেই রাজনীতি মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, বিদ্বেষ ছড়ায় এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।তিনি বলেন, “মতপার্থক্য গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু মতভেদ কখনোই ঘৃণা, সহিংসতা কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। মানবিকতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানই হোক আমাদের রাজনৈতিক চর্চার ভিত্তি। তিনি আরও বলেন, সমাজে যখন রাজনৈতিক সহনশীলতা থাকে, তখন উন্নয়নের পরিবেশও তৈরি হয়। বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত ও বিদ্বেষের পরিবেশ অর্থনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তরুণ সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মই আগামী বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভেদ ছড়ানোর পরিবর্তে জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি শিক্ষা, উদ্যোক্তা হওয়া এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করা। তিনি বলেন, “আমরা যদি প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ করার চেষ্টা করি, একজন মানুষকে সম্মান দিই, কাউকে কষ্ট না দিই এবং নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি, তাহলে সমাজ বদলাতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে রায়হান কবির মিল্টন বলেন, তিনি জনগণের প্রতিনিধি হতে চান মানুষের সেবা করার লক্ষ্য নিয়ে। নির্বাচনী রাজনীতিকে তিনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং মানুষের আস্থা অর্জন এবং এলাকার উন্নয়নের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখতে চান। তিনি বলেন, লোহনীপাড়া ইউনিয়নের উন্নয়ন, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষাকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চান। মানুষের পাশে থেকে একটি নিরাপদ, আধুনিক এবং বৈষম্যহীন ইউনিয়ন গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য।
বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি দেশবাসীর প্রতি আবেগঘন আহ্বান জানিয়ে বলেন, “জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। তাই অকারণ বিরোধ, বিদ্বেষ কিংবা হিংসায় সময় নষ্ট না করে নিজের পরিবার, নিজের কাজ, সততা, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিন। অন্যের ক্ষতি করার চিন্তা নয়, বরং নিজের উন্নতি এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করুন। শান্তিতে বাঁচা, মানুষকে সম্মান করা এবং ভালো কাজ করে যাওয়াই হোক আমাদের সবার সবচেয়ে বড় পরিচয়।” তার এই বক্তব্য সামাজিক সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে সামাজিক বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একজন জনপ্রতিনিধি পদপ্রার্থীর এমন মানবিক ও ইতিবাচক বার্তা সমাজে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।