
উত্তরাঞ্চলের বঞ্চনা নিরসনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা
আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ) রংপুর
গণভোটে প্রদত্ত গণরায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের দাবিতে আগামী ১১ জুলাই রংপুরে অনুষ্ঠিত হবে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশ। এ সমাবেশকে সফল করতে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধ্যায় রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, দেশের জনগণ দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, দমন-পীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। সেই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে জনগণ তাদের সুস্পষ্ট মতামত প্রদান করেছে। কিন্তু জনগণের দেওয়া সেই গণরায়ের বাস্তবায়নে এখনও প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে জনগণের মতামত ও রায়। জনগণ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্র ও সরকারের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক দায়িত্ব। জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে কিংবা বাস্তবায়নে গড়িমসি করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের অস্তিত্বের প্রশ্ন
তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গে মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তিস্তা নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তাপাড়ের মানুষ নদীভাঙন, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, বন্যা ও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো নানামুখী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে সরকার ও রাজনৈতিক মহল থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে উত্তরাঞ্চলের মানুষ নিজেদেরকে উন্নয়ন বঞ্চনার শিকার মনে করছে। তিনি তিস্তার ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।
সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন নিয়ে উদ্বেগ
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, নির্যাতন এবং পুশ-ইনের ঘটনা দেশের সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, “প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জীবন রাষ্ট্রের কাছে মূল্যবান। সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের ঘটনার স্থায়ী সমাধানে সরকারকে আরও কার্যকর, দৃঢ় ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।”
দ্রব্যমূল্য ও জনদুর্ভোগে অতিষ্ঠ মানুষ
মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটে চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণের এসব বাস্তব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।
উত্তরাঞ্চলের ন্যায্য অধিকার আদায়ে গণমঞ্চ হবে বিভাগীয় সমাবেশ
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক গণসমাবেশগুলোতে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে মানুষ তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশাসন ও জনকল্যাণমূলক দাবির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। রংপুরে অনুষ্ঠিতব্য বিভাগীয় সমাবেশ উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, সমস্যা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে এবং ন্যায্য দাবি আদায়ের একটি শক্তিশালী গণমঞ্চ হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর মহানগর আমির এটিএম আযম খান, রংপুর জেলা আমির ও রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, মহানগর সেক্রেটারি কেএম আনোয়ারুল হক কাজল, জেলা সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হক, মহানগর প্রচার ও মিডিয়া বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাওছার আলী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রংপুর জেলা আহ্বায়ক আল মামুন, মহানগর সদস্য সচিব আব্দুল মালেক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রংপুর মহানগর সভাপতি মাওলানা ইব্রাহিম খলিল, সাধারণ সম্পাদক মুফতি নেয়ামতুল্লাহসহ ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলন থেকে আগামী ১১ জুলাই রংপুরে অনুষ্ঠিত হবে বিভাগীয় সমাবেশ। সেখানে সর্বস্তরের জনগণ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবসমাজ, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, এ সমাবেশ উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসবে এবং জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের আন্দোলনকে আরও বেগবান করবে।