৪৬ কোটির বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা, আসনসংকট নিরসনের স্বপ্ন অধরাই; একটি বিদ্যালয় চালু হতে অপেক্ষা আরও অন্তত এক বছর
রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুর নগরীতে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার পরিধি বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের আসনসংকট দূর করা এবং আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রায় আট বছর আগে নেওয়া হয়েছিল দুটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণের উদ্যোগ। প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় আশা করা হয়েছিল, নতুন দুটি বিদ্যালয় চালু হলে প্রতিবছর সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য হাজারো শিক্ষার্থীর হাহাকার অনেকটাই কমে যাবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য সৃষ্টি হবে মানসম্মত শিক্ষার নতুন দুয়ার।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রকল্প অনুমোদনের আট বছর এবং নির্মাণকাজ শুরুর চার বছর পার হলেও এখনো বিদ্যালয় দুটির নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার চুক্তি থাকলেও সময়সীমা অতিক্রম করেছে এক বছরেরও বেশি। একটি বিদ্যালয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও অন্যটির নির্মাণকাজ এখনো অনেক দূর বাকি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বিদ্যালয় চলতি বছরের শেষ দিকে হস্তান্তর করা সম্ভব হলেও অন্যটির কাজ শেষ হতে আরও অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে।
এদিকে দীর্ঘ বিলম্বে ক্ষোভ বাড়ছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও তদারকির অভাবের কারণে শিক্ষা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই প্রকল্প
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুরে নতুন দুটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্পটি ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পের আওতায় রংপুর নগরীর উত্তম মৌজার হাজীপাড়া পুরোনো রেডিও সেন্টার এলাকায় একটি এবং কামাল কাছনা মৌজার বোতলাপাড়া এলাকায় আরেকটি আধুনিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা প্রণয়ন এবং দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২১ সালের আগস্টে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়। ২০২২ সালের মার্চ মাসে এসএসএল-এসই-এমএ জেভি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। একই বছরের ২৩ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
প্রতিটি বিদ্যালয়ের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ২৩ কোটি ১০ লাখ ৮ হাজার ৪৩২ টাকা। অর্থাৎ দুই বিদ্যালয়ের জন্য মোট ব্যয় প্রায় ৪৬ কোটি ২০ লাখ টাকারও বেশি। চুক্তি অনুযায়ী ৩৬ মাসের মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও নির্মাণ শেষ হয়নি।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
সম্প্রতি সরেজমিনে দুই নির্মাণস্থল ঘুরে দেখা যায়, হাজীপাড়ার পুরোনো রেডিও সেন্টার এলাকায় নির্মাণাধীন বিদ্যালয়ের মূল ভবনের কাঠামো দৃশ্যমান হলেও ভবনের প্লাস্টার, রঙ, জানালার গ্রিল, দরজা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্যানিটেশন এবং অভ্যন্তরীণ ফিনিশিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো অসমাপ্ত। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
অন্যদিকে বোতলাপাড়া এলাকায় নির্মিত বিদ্যালয়ের ভবনের প্রধান অবকাঠামো প্রায় সম্পন্ন হলেও রং করা, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক স্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং কিছু আনুষঙ্গিক কাজ এখনো বাকি রয়েছে। ফলে ভবন প্রস্তুত হলেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে আরও সময় লাগবে।
বিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াই আরও কঠিন
রংপুরে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা খুবই সীমিত। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেও অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই সুযোগ পায়। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে উচ্চ ব্যয়ে বেসরকারি বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করায়।
নগরীর শাপলা চত্বর হাজীপাড়া চামড়াপট্টি এলাকার বাসিন্দা আইরিন আক্তার বলেন,”আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বেসরকারি স্কুলে সন্তানদের পড়ানো খুবই কঠিন। সরকারি স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন থাকে, কিন্তু আসনসংখ্যা কম হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী সুযোগ পায় না। নতুন দুটি বিদ্যালয়ের খবর শুনে আমরা অনেক আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও বিদ্যালয় চালু হলো না। দ্রুত কাজ শেষ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর দাবি জানাই।”
অভিভাবকদের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না
মেডিকেল মোড় জেলগেট এলাকার বাসিন্দা হামিদা আফরোজ বলেন,”সরকার নতুন বিদ্যালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় আমরা ভেবেছিলাম সন্তানকে সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে পারব। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সেই সুযোগ আর হলো না। উন্নয়ন প্রকল্প যদি সময়মতো শেষ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
তিনি আরও বলেন, নতুন বিদ্যালয় দুটি চালু হলে শুধু আসনসংকটই কমবে না, শিক্ষার মানও আরও উন্নত হবে।
শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ
রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, “প্রতিবছর সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ব্যাপক প্রতিযোগিতা হয়। নতুন দুটি বিদ্যালয় চালু হলে বহু শিক্ষার্থী উপকৃত হতো। কিন্তু নির্মাণকাজে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে আগামী শিক্ষাবর্ষেও এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। শিক্ষা খাতে এ ধরনের বিলম্ব কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
তার মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে সময়সীমা রক্ষা না হলে সরকারের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য
বেতারপাড়া প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রকৌশলী মাহমুদ বলেন, “কাজ অব্যাহত রয়েছে। নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালাতে পারলে প্রকল্পের বাকি অংশ শেষ করতে অন্তত আরও ছয় মাস সময় প্রয়োজন হবে।”
বিলম্বের কারণ যা বলছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর
রংপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রতীশ চন্দ্র সেন বলেন, “করোনা মহামারির পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং কিছু কারিগরি জটিলতার কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি।”
তিনি জানান, বোতলাপাড়ার বিদ্যালয়ের কাজ আগামী অক্টোবর-নভেম্বর মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে ভবন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তবে হাজীপাড়ার বিদ্যালয়ের কাজ শেষ হতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে বলেও তিনি জানান।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, সময় বাড়লেও প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে না। ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করে প্রধান শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর করা পর্যন্ত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্ব। এরপর শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থী ভর্তি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পন্ন করবে।
প্রশ্ন উঠছে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সময়মতো কাজ শেষ হলে ইতোমধ্যে দুই বিদ্যালয়ে কয়েক দফা শিক্ষার্থী ভর্তি সম্পন্ন হতে পারত। কিন্তু নির্মাণ বিলম্বের কারণে সেই সুযোগ হারিয়েছে হাজারো শিক্ষার্থী।
শিক্ষাবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে রংপুরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চাহিদা অনেক বেড়েছে। নতুন দুটি বিদ্যালয় চালু হলে শুধু আসনসংকটই কমবে না, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দ্রুত কাজ শেষের দাবি
অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিকদের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য যেন বিলম্বের কারণে ব্যাহত না হয়। তারা চান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্মাণকাজে গতি এনে দ্রুত বিদ্যালয় দুটি সম্পন্ন করুক, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করুক এবং বহু প্রতীক্ষিত সরকারি বিদ্যালয়ের সুবিধা রংপুরবাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিক।
রংপুরবাসীর প্রত্যাশা, আর কোনো অজুহাত নয়—দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত চালু হোক আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এই দুই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। কারণ প্রতিটি বিলম্বিত দিন মানসম্মত সরকারি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে, আর দীর্ঘায়িত করছে হাজারো পরিবারের অপেক্ষা।