তালিকার বাইরে ১৬০ টন ধান কেনার অভিযোগ।
৮০ কৃষকের নামে ভুয়া তালিকার দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সিংহ রায় এবং উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) রায়হান কবিরের বিরুদ্ধে। সরকারি তালিকার বাইরে ৮০ জন কৃষকের নামে কথিত ভুয়া তালিকা তৈরি করে ১৬০ টন বোরো ধান সংগ্রহ, পরে তা সরকারি গুদামে সমন্বয় করে কৃষকদের নামে বিল তৈরির অভিযোগও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্ত, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বদরগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা ও জুলাই যোদ্ধারা। রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টায় উপজেলার শাহাপুর আঞ্জুমান ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বক্তারা অভিযোগ করেন, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার রায় দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে ঘুষ বাণিজ্য ও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের পাশাপাশি মাদকাসক্তির অভিযোগও তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গুদাম ঘিরে ‘সিন্ডিকেট’, নেতৃত্বে ওসিএলএসডি—অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা দাবি করেন, বদরগঞ্জ সরকারি খাদ্যগুদামকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ওসিএলএসডি রায়হান কবির রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, রায়হান কবিরের প্রত্যক্ষ মদদে হামিদুল, ফরহাদ হোসেন, জিয়ারুল ইসলাম ও সুমনসহ কয়েকজন সরকারি ধান, চাল ও গম সংগ্রহে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত। প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করে কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খাদ্যশস্য সংগ্রহ এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেন বক্তারা।
৮৩৩ কৃষক লটারিতে নির্বাচিত, তবু তালিকার বাইরে ধান কেনার অভিযোগ
চলতি বোরো মৌসুমে বদরগঞ্জে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ১ হাজার ৬৫০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দের বিপরীতে উপজেলা প্রশাসন লটারির মাধ্যমে ৮৩৩ জন কৃষককে নির্বাচিত করে। নির্বাচিত তালিকা খাদ্য বিভাগে পাঠানোর পর প্রত্যেক কৃষকের কাছ থেকে দুই টন করে ধান কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। উপজেলা ধান ক্রয়-সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ও ইউএনও আঞ্জুমান সুলতানার নির্দেশনায় গত ১৪ জুন ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহের সময়সীমা থাকলেও ৯ আগস্টের মধ্যে সংগ্রহ অভিযান শেষ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এর মধ্যেই অভিযোগ ওঠে, লটারিতে নির্বাচিত কৃষকদের তালিকার বাইরে গিয়ে ৮০ জনের নামে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।
৮ ও ৯ আগস্ট ১৬০ টন ধান কেনার অভিযোগ
বদরগঞ্জ থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে জুলাই যোদ্ধা ও রংপুর জেলা ছাত্র সমন্বয়ক রেজওয়ানুল হাসান দাবি করেন, গত ৮ ও ৯ আগস্ট বদরগঞ্জ পৌর যুবদলের সদস্যসচিব জিয়াউল হক জিয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করে তালিকার বাইরে ১৬০ টন ধান কেনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে সরকারি গুদামে ধান সমন্বয় করে নির্বাচিত কৃষকদের নামে বিল তৈরি করা হয় এবং ব্যাংক থেকে সেই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, এ প্রক্রিয়ায় জিয়াউল হক জিয়া ও সুমনের মাধ্যমে ওসিএলএসডি এবং উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।
ধান বিক্রির কথা স্বীকার মিল মালিকের
ওসমানপুর এলাকার একটি অটো রাইস মিলের মালিক ফরহাদ হোসেন জানান, ক্রাশিংয়ের জন্য তিনি ২৪০ টন ধান বরাদ্দ পেয়েছিলেন। এর মধ্যে ৮০ টন ধান গুদামে রেখে জিয়াসহ তিনজনের কাছে বিক্রি করেছেন। তবে তিনি কার কাছে কত দামে ধান বিক্রি করেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।
অভিযোগ অস্বীকার জিয়াউল হক জিয়ার
তালিকার বাইরে ধান কেনা ও সরকারি গুদামে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বদরগঞ্জ পৌর যুবদলের সদস্যসচিব জিয়াউল হক জিয়া।তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যা। আমি কারও কাছ থেকে ধান কিনে গুদামে দিইনি।”
‘ওপরের চাপে ধান কিনেছি’—ওসিএলএসডি
অভিযোগের বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রায়হান কবির বলেন, ক্রাশিংয়ের জন্য চালকল মালিকদের বরাদ্দ দেওয়া ধান সমন্বয় করার কোনো সুযোগ নেই। একটি স্বার্থান্বেষী মহলের অন্যায় আবদার না শোনায় তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে তালিকার বাইরে ধান কেনার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “তালিকাভুক্ত কৃষক না আসায় ওপরের চাপে ধান কিনেছি।”
ফোন ধরেননি উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার রায়ের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘তালিকার বাইরে ধান কেনার সুযোগ নেই’—ইউএনও
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আঞ্জুমান সুলতানা বলেন, আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান ক্রয়ের সময়সীমা রয়েছে। এর আগে তালিকার বাইরে ধান কেনার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস পুলিশের
বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন, ধান কেনায় অনিয়মের অভিযোগে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, খাদ্যশস্য সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কারণ সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহ করা। সেখানে নির্বাচিত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকার বাইরে ধান কেনা হয়ে থাকলে তা সরকারি নীতিমালা ও কৃষকদের স্বার্থের পরিপন্থী।তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কথিত অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও খাদ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এনে প্রয়োজনীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।