নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর।।
সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণ, সঠিক সময়ে রিপোর্টিং এবং কার্যকর রোগ নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামসহ সংক্রামক রোগ মোকাবেলা বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ ওরিয়েন্টেশন সভায় রোগ নজরদারি কার্যক্রমের গুরুত্ব, সন্দেহজনক রোগী শনাক্তকরণ, তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, যথাসময়ে রিপোর্ট প্রদান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দেখা দিতে পারে এমন বিভিন্ন সংক্রামক ও গুরুতর রোগের লক্ষণ সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মোঃ আশিকুল আরেফিন। তিনি রোগ নজরদারি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, কমিউনিটি পর্যায়ের কর্মী এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. মোঃ আশিকুল আরেফিন বলেন, রোগ প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলেই হবে না, রোগের ঝুঁকি ও বিস্তার সম্পর্কে আগে থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করে নির্ধারিত নিয়মে রিপোর্ট করতে হবে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে রোগ নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
তিনি বলেন, কোনো সংক্রামক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সময়মতো শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। এতে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। তাই রোগী শনাক্তকরণ, তথ্য সংগ্রহ, রিপোর্টিং ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে।
ওরিয়েন্টেশন সভায় AES, AFP ও হাম রোগের বিভিন্ন লক্ষণ, সন্দেহজনক কেস চিহ্নিতকরণ এবং এসব রোগের বিষয়ে দ্রুত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে রোগ নজরদারি কার্যক্রমের আওতায় সংগৃহীত তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতন করা হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় রোগ নজরদারি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো এলাকায় রোগের উপসর্গ বা সংক্রমণের প্রবণতা দেখা দিলে তার তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এ কারণে মাঠপর্যায়ে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের চোখে পড়া কোনো সন্দেহজনক ঘটনা বা রোগের উপসর্গকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তা যথাযথভাবে রিপোর্ট করা জরুরি।
বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের নজরদারি কার্যক্রমের গুরুত্ব আরও বেশি বলে সভায় উল্লেখ করা হয়। শিশুদের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে অভিভাবকদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদেরও বিষয়টি যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে, হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত রোগ নজরদারিকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। টিকাদান কর্মসূচির আওতায় কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরে টিকাদান ও রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগের গতিপ্রকৃতি ও সম্ভাব্য বিস্তার সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়া গেলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত ওরিয়েন্টেশন, প্রশিক্ষণ ও সমন্বয় সভা স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সভায় আরও বলা হয়, রোগ শনাক্তকরণে সামান্য দেরিও অনেক সময় বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই রোগের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত তা শনাক্ত করে সঠিক প্রক্রিয়ায় রিপোর্টিং নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো রোগীর তথ্য গোপন না রেখে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্ধারিত নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টিকাদান কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত স্বাস্থ্যশিক্ষা, রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম এবং নজরদারি ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে এলাকার মানুষের জন্য আরও নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি কার্যকর রোগ নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে কোনো রোগের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাওয়া যায় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়। আর এ ব্যবস্থাকে সফল করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয়তা, সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ধারিত সময়ে রিপোর্টিং অপরিহার্য।
এদিকে, ওরিয়েন্টেশন সভায় অংশ নেওয়া স্বাস্থ্যকর্মীরাও রোগ শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব আরও গুরুত্বের সঙ্গে পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তারা জানান, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় রোগ নজরদারি কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন।
সভায় উপস্থিত স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে ইউএইচএফপিও ডা. মোঃ আশিকুল আরেফিন রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও রোগ প্রতিরোধে সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বদরগঞ্জে এ ধরনের ওরিয়েন্টেশন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকলে রোগ শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। এর ফলে সম্ভাব্য সংক্রামক রোগ দ্রুত শনাক্ত করা, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা, টিকাদান ও কার্যকর রোগ নজরদারি এই তিনটি কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপরই জোর দিচ্ছে বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সুস্থ শিশু, সচেতন পরিবার ও নিরাপদ বাংলাদেশ—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে বদরগঞ্জে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যক্রম আরও জোরদার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ) /রংপুর