মোঃ মাসুম সরদার, দৈনিক ইবি নিউজ: বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
১৯৮১ সালে তাঁর স্বামী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর ২০ মার্চ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর প্রথম মেয়াদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা, নারীশিক্ষা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সংকট ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে ব্যাপক রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। একই বছরের জুনে পুনরায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দফায় সরকার পরিচালনা ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া আবারও প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হয়। এ সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, পোশাকশিল্প ও নারীশিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রশাসনিক নানা বিষয়ে সমালোচনাও ছিল।
২০০৬ সালে তাঁর সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ২০০৭ সালে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেন।
বিরোধী রাজনীতিতে দীর্ঘ সংগ্রাম
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হওয়ার পর খালেদা জিয়া বিরোধী দলের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন। নির্বাচন, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যায়।
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাদণ্ড হয়। পরে ২০২০ সালে মানবিক কারণে তাঁর সাজা স্থগিত করে তাঁকে বাসায় থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পান। ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতি মামলাগুলোর আইনি অবস্থাতেও পরিবর্তন আসে।
রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া যেমন নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছেন, তেমনি নানা রাজনৈতিক আন্দোলন, মামলা, কারাবাস ও বিতর্কের মুখোমুখিও হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের আরেক প্রধান রাজনৈতিক নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে কয়েক দশক ধরে দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। দুই নেত্রীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও পালাবদল বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, অর্জন, বিতর্ক এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল সাফল্য, আন্দোলন, ক্ষমতা, বিরোধিতা, সংকট ও বিতর্কে পরিপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দীর্ঘদিন আলোচিত হবে।
আজ তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির এই প্রভাবশালী নেত্রীকে।