শিরোনাম :
রংপুরে নারী পুলিশ সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং জোরদারে কর্মশালা অনুষ্ঠিত বদরগঞ্জে শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগ উঠেছে আরেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শিশু অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ক সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত সিসিডিবি’র উদ্যোগে প্রশিক্ষণ মোরেলগঞ্জে ৪ কিলোমিটারের একাধিক বাঁধ অপসারণ করলেন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মোরেলগঞ্জে ক্যাডেট মাদ্রাসার উদ্যাোগে ২৫ জন শিক্ষার্থীকে সবক প্রদান রাঙ্গামাটিতে কোতয়ালী পুলিশের বিশেষ অভিযান: চোলাইমদ ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ গ্রেফতার ৪ শাহরাস্তিতে বিএনপি নেতা সেলিমের বিরুদ্ধে ১০ সরকারি গাছ কাটার অভিযোগ কালীগঞ্জে বসত বাড়ীতে হামলা করে স্বর্ণালংকারসহ ২৫ লাখ টাকার মালামাল লুট মোরেলগঞ্জে এক কৃষকের কাটিমন আম চাষে বাম্পার ফলন
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন

রংপুরে নারী পুলিশ সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং জোরদারে কর্মশালা অনুষ্ঠিত

Reporter Name
Update : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।। 

 

বেদনশীল পুলিশিং কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ এবং কর্মক্ষেত্রে নারী সদস্যদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন) আয়োজিত দিনব্যাপী কর্মশালা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রংপুর পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় রংপুর বিভাগ ও রেঞ্জের ৭৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা, নারী পুলিশ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।

“বিপিডব্লিউএন কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৪-২০২৭ বাস্তবায়ন” শীর্ষক এ কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, নেতৃত্ব বিকাশ, কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের জন্য আরও কার্যকর, মানবিক ও ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক পুলিশি সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে মতবিনিময় ও সচেতনতা বৃদ্ধি।

কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মশালার উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং নারী পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, “যোগ্যতা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসই একজন পুলিশ সদস্যের সবচেয়ে বড় শক্তি। নারী সদস্যদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং দায়িত্ব পালনে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হতে হবে।”

 

তিনি বলেন, “নারী সদস্যরা কখনোই বাহিনীর জন্য অতিরিক্ত বোঝা নন। তারা পুরুষ সদস্যদের মতোই একই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং একই পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। ফলে দায়িত্ব পালনে তাদের সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার সুযোগ নেই। প্রয়োজন কেবল উপযুক্ত পরিবেশ, সুযোগ এবং আত্মবিশ্বাস।”

 

ডিআইজি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে পুলিশিং কার্যক্রমে নারীদের ভূমিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তদন্ত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, কমিউনিটি পুলিশিং, সাইবার অপরাধ দমনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারী পুলিশ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এ কারণে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য আরও নিরাপদ, সম্মানজনক ও সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

 

তিনি পুরুষ সহকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরিতে তাদের আরও ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে নারী সদস্যদেরও একে অপরের প্রতি সহমর্মী ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করার পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ। তিনি বলেন, আধুনিক পুলিশ বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি শুধু সময়ের দাবি নয়, বরং কার্যকর ও জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। নারী সদস্যদের জন্য নিরাপদ ও উপযোগী কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

 

কর্মশালায় বিপিডব্লিউএনের কৌশলগত পরিকল্পনা (২০২৪-২০২৭) এবং এর বাস্তবায়ন কার্যক্রমের বিস্তারিত উপস্থাপন করেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (এমটি ও কর্মশালা) এবং বিপিডব্লিউএনের সহ-সভাপতি শামসুন্নাহার।

 

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাগত উন্নয়ন, নেতৃত্ব বিকাশ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার আলোকে নারী সদস্যদের জন্য একটি সহায়ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছি।”

 

তিনি আরও বলেন, বিপিডব্লিউএন শুধুমাত্র নারী সদস্যদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করে না; বরং পুরো পুলিশ বাহিনীতে জেন্ডার-সংবেদনশীল সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের জন্য আরও উন্নত ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও কাজ করছে।

 

দিনব্যাপী কর্মশালায় জেন্ডার-সংবেদনশীল পুলিশিং, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পৃথক সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

 

ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি সাদিয়া তাসনীম কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার রেসপনসিভ পুলিশিং ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান অবচেতন বৈষম্যমূলক মনোভাব দূর করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে, যাতে নারী সদস্যরা নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে কাজ করতে পারেন।”

 

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কর্মশালা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ইউএন অপারেশনস) ফাতেমা-তুজ-জোহরা প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV), অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ মোকাবিলার বিষয়ে আলোচনা করেন।

 

তিনি বলেন, প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত অনলাইন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল এবং বিভিন্ন ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

 

অপরদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরিদা পারভীন পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, কর্মস্থলের চাপ মোকাবিলা এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।

 

তিনি বলেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব এবং পারিবারিক ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে অনেক পুলিশ সদস্য মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

 

কর্মশালার বিভিন্ন অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন এবং কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তারা অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে গঠিত কমিটিগুলোকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর করা প্রয়োজন।

 

অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, অনেক ক্ষেত্রে নারী সদস্যরা অভিযোগ জানাতে দ্বিধাবোধ করেন। তাই অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য, গোপনীয় এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

 

তারা প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা বৃদ্ধির সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য আবাসন, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্য রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।

 

উল্লেখ্য, ইউএন উইমেন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আসছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে বাস্তবায়িত “এন্ডিং সেক্সুয়াল অ্যান্ড জেন্ডার-বেসড ভায়োলেন্স ইন পাবলিক স্পেসেস, ওয়ার্কপ্লেসেস অ্যান্ড ইন টারশিয়ারি এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনস ইন বাংলাদেশ (ESGBV)” প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পুলিশ ও বিপিডব্লিউএন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।

 

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ধরনের কর্মশালা নারী পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা, নেতৃত্ব ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির পাশাপাশি পুরো পুলিশ বাহিনীতে জেন্ডার-সংবেদনশীল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে জনগণের জন্য আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক পুলিশি সেবা নিশ্চিত করতেও এ উদ্যোগ কার্যকর অবদান রাখবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category