শিরোনাম :
মোরেলগঞ্জের খাউলিয়ায় কোডেকের সংলাপ অনুষ্ঠিত সবুজের আড়ালে কৃষকের চোখের জল: ডুমুরিয়ায় সিন্ডিকেটের জালে পিষ্ট সবজিচাষিরা ডুমুরিয়ার টিপনা আদর্শ গ্রামে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে কর্মকর্তাদের স্থান পরিদর্শন ফ্যাসিস্ট হাসিনা তার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য বহু ষড়যন্ত্র করেছে। গোলাম পরওয়ার. বদরগঞ্জে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় ।  বিসিএস ক্যাডার হতে চায় গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া কৃতি শিক্ষার্থী আলিফ ‎বদরগঞ্জে খাদ্যশস্য সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ: খাদ্য কর্মকর্তা, ওসিএলএসডি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন মামলার দফাওয়ারি জবাব না দেওয়ার অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতায় ভোগান্তিতে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোরেলগঞ্জে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদযাপিত কালীগঞ্জে ব্যবসায়ীল বাড়ীতে ডাকাতির ঘটনায় গৃহকর্ত্রী খুন, বাবা-মেয়ে গুরুতর জখম মোঃ মুক্তাদির হোসেন,
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৫৯ অপরাহ্ন

সবুজের আড়ালে কৃষকের চোখের জল: ডুমুরিয়ায় সিন্ডিকেটের জালে পিষ্ট সবজিচাষিরা

Reporter Name
Update : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা): দূর থেকে তাকালে মনে হবে যেন সবুজের এক বিশাল সমুদ্র। যতদূর চোখ যায়—উচ্ছে, করলা, শসা, মিষ্টি কুমড়া আর চালকুমড়ার ডাগর ডাগর পাতায় ঢেকে আছে মাঠের পর মাঠ। প্রকৃতির বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই সবজি খেতগুলোকে দেখলে মনে হয় জীবনের এক অপার সম্ভাবনা। কিন্তু এই নজরকাড়া সবুজের পেছনের নির্মম বাস্তবতা খুব কম মানুষেরই জানা।

ডুমুরিয়ার মাঠে মাঠে যে ফসল আজ হাসছে, তা একদিনে গড়ে ওঠেনি। টানা তিন থেকে চার মাস ধরে পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন চাষিরা। অগণিত অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি সয়েছেন প্রকৃতির রুক্ষ রূপ। কখনো তীব্র রোদে পুড়ে, কখনো ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে, আবার কখনো বজ্রপাতের ভয় উপেক্ষা করে মাঠে দাঁড়িয়ে থেকেছেন তারা। প্রতিটি চারা গাছের সঙ্গে মিশে আছে কৃষকের ঘাম। আর প্রতিটি সবজির ভেতরে লুকিয়ে আছে একেকটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধের দাম আর বেঁচে থাকার আকুল সংগ্রাম।
তবে কৃষকের আসল লড়াই এবং নির্মম অধ্যায় শুরু হয় ফসল তোলার পর, বাজারে গিয়ে।
অভিনব প্রতারণা ও সিন্ডিকেটের জিম্মিদশা
বর্তমানে ডুমুরিয়ার পাইকারি সবজির বাজার চলে গেছে কতিপয় অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে।
নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো পণ্য বিক্রির আগেই তার মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু ডুমুরিয়ার আড়তগুলোতে ঘটছে ঠিক উল্টোটা। সকালে কৃষক তার রক্তঘামে ফলানো শসা, করলা কিংবা অন্য সবজি আড়তে জমা দিয়ে আসেন। কিন্তু তখনো তিনি জানেন না তার নিজের ফসলের দাম কত! সারাদিন কৃষকের সবজি বিক্রি শেষে রাতের বেলা কিছু ব্যবসায়ী নিজেদের সুবিধামতো বসে দাম নির্ধারণ করেন। কখনো কেজিপ্রতি ৮ টাকা, কখনো ১০ টাকা, তো কখনো ১২ টাকা! এ যেন মুক্ত বাজারের নামে দিনের আলোয় এক ভয়াবহ প্রতারণা। কৃষকের মতামতের কোনো মূল্য নেই, নেই তার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের স্বীকৃতি। সিন্ডিকেটের ইচ্ছেমতো ঠিক করা দরই মেনে নিতে বাধ্য হন নিঃস্ব কৃষক।

কৃষক বঞ্চিত, ভোক্তা দিশেহারা: লাভবান মধ্যস্বত্বভোগী
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, মাঠপর্যায়ে কৃষক যে সবজি ৮ বা ১০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, বাজারে সাধারণ ভোক্তাকে সেই একই সবজি কিনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি দামে। অর্থাৎ কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, অন্যদিকে চড়া দামে পণ্য কিনে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ভোক্তার। মাঝখান থেকে সিংহভাগ মুনাফা পকেটে পুরছে অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট চক্র।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার
ডুমুরিয়ার এই অমানবিক বাজারব্যবস্থা ও কৃষকদের চরম দুর্ভোগের বিষয়ে খুলনা ও ডুমুরিয়ার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলা হলে তারা কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দেন।

উপজেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল রাজ্জাক বলেন:
“পণ্য জমা নেওয়ার পর রাতে দাম নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অনৈতিক। কৃষি বিপণন আইনের আলোকে এটি একটি গুরুতর অপরাধ। আড়তগুলোতে ‘ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড’ ও উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে দিনের শুরুতেই দাম নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ডুমুরিয়ার আড়তগুলোতে চাষিদের বঞ্চনা বন্ধে আমরা দ্রুতই বিশেষ নজরদারি ও অভিযান জোরদার করব। কৃষক যেন তার পণ্যের মূল্য আগে জেনে বিক্রি করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা হবে।”
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নাজমুল হুদা বলেন:
“আমাদের ডুমুরিয়ার কৃষকরা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং খুলনাসহ সারা দেশের সবজির একটা বড় অংশের জোগান দেন তারা। মাঠপর্যায়ে বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে আমরা সব ধরনের কৃষি প্রযুক্তি ও পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকি। কিন্তু বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের চক্রান্তে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের সব উৎসাহ ভেঙে পড়ে। চাষিদের ন্যায্যমূল্য পাইয়ে দিতে আমরা কৃষি বিপণন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সরাসরি ‘কৃষক বাজার’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছি, যাতে কৃষকরা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে ভালো দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন।”

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ সবিতা সরকার বলেন:
“কৃষকদের রক্তঘামে অর্জিত ফসলের মূল্য আড়তদাররা ইচ্ছেমতো রাতে ঠিক করবে—এমন মনগড়া নিয়ম কোনোভাবেই চলতে দেওয়া হবে না। এটি সরাসরি কৃষকের সঙ্গে প্রতারণা। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে অভিযোগ পেয়েছি। অতি দ্রুত বাজারগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনাসহ সিন্ডিকেট চক্র ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো আড়তদার বা মধ্যস্বত্বভোগীকে কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category