নিজস্ব প্রতিবেদক রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ও কুতুবপুর ইউনিয়ন ঘেঁষে বয়ে যাওয়া যমুনেশ্বরী নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে সৃষ্টি হওয়া গভীর খাদে তলিয়ে ইসাহাক আলী (৫৫) নামে এক ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজের প্রায় ২২ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টার দিকে নদীর নাগেরহাট এলাকার একটি পয়েন্ট থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে বুধবার দুপুর ২টার দিকে একই এলাকায় গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হন তিনি। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, যমুনেশ্বরী নদীর পশ্চিম পাশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান কয়েকটি অবৈধ বালু উত্তোলন পয়েন্ট রয়েছে। সেখানে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশে অস্বাভাবিক গভীরতা ও বিপজ্জনক খাদ সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার দুপুরে ওই গভীর অংশে গোসল করতে নেমে হঠাৎ স্রোতের টানে সাঁতার না জানায় তলিয়ে যান ইসাহাক আলী। ঘটনাস্থলে তার ব্যবহৃত লুঙ্গি, গামছা, শার্ট ও স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা তার হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।
নিখোঁজ ব্যক্তির ভাতিজা শফিকুল ইসলাম জানান, খেয়াঘাট দিয়ে পারাপারের সময় কয়েকজন ব্যক্তি তার চাচার তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে দ্রুত পরিবারকে খবর দেন। পরে তারা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করলে রংপুর ও বদরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান।তিনি বলেন, বুধবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এবং বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ডুবুরি দল নদীর বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালায়। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরেরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়, যা আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
বদরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দলনেতা আবু মোতালেব বলেন, সংবাদ পাওয়ার পরপরই আমাদের দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। নদীর গভীরতা ও স্রোতের কারণে উদ্ধার কাজ বেশ কঠিন ছিল। দীর্ঘ সময়ের চেষ্টার পর অবশেষে মরদেহটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এ বিষয়ে বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার জানান, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লিখিত সম্মতির ভিত্তিতে মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় থানায় একটি ইউডি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতে কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনেশ্বরী নদীর বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও গভীর খাদ তৈরি হচ্ছে, যা এখন সাধারণ মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নদীর এই গভীর গর্তগুলো এখন একেকটি মৃত্যু ফাঁদ। প্রতিনিয়ত এখানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তারা আরও অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন চলায় প্রশাসনের অভিযানও অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। ফলে নদীর পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এলাকাবাসীর জোর দাবি, অবিলম্বে যমুনেশ্বরী নদীর সকল অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।