*গোপীনাথপুরে যুবসমাজ নিয়ে উদ্বেগ।
*প্রতিবাদ করলেই হুমকির অভিযোগ।
*প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি
রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ৭ নম্বর গোপীনাথপুর ইউনিয়নের মৌয়াগাছ (মাঝাপাড়া) এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই গ্রামের সুধাংশু চন্দ্র রায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত। একাধিকবার আটক হওয়ার পরও তিনি কথিত মাদক কারবার থেকে সরে আসেননি। এমনকি ২০২৪ সালে স্থানীয়দের হাতে মাদকসহ আটক হওয়ার পর মাদক ব্যবসা না করার লিখিত মুচলেকা দিয়েও ফের একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও বদরগঞ্জ উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে তার মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে এলাকার তরুণ ও যুবসমাজের একটি অংশ বিপথগামী হচ্ছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মাদকের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মাদক কারবারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি, মামলা ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকে মাদক ব্যবসার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মাদকসহ সুধাংশু চন্দ্র রায়কে কয়েকজন গ্রামবাসী আটক করেন। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তিনি একটি মুচলেকা দেন বলে জানা গেছে। মুচলেকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মাদক কেনাবেচা করবেন না এবং পুনরায় মাদক ব্যবসায় জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে এমন অঙ্গীকার করেন বলেও জানা গেছে। মুচলেকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হিসেবে গোপীনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদ, বদরগঞ্জ থানা, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখার কথা উল্লেখ ছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই অঙ্গীকারের পরও মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।’ শুরুতে মৌয়াগাছ ও আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে এর বিস্তার ঘটেছে। হৃদয় নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “মাদক এখন শুধু একটি বাড়ি বা একটি গ্রামের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পুরো এলাকায় পড়ছে। তরুণ ছেলেরা নষ্ট হচ্ছে, পরিবারের মধ্যে অশান্তি বাড়ছে। প্রশাসন যদি নিয়মিত অভিযান চালায় এবং মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৮ আগস্ট রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বদরগঞ্জের বুড়িপুকুর হাট এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠে। খবর পেয়ে মাঝাপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা সেখানে গিয়ে সুধাংশু চন্দ্র রায়কে আটকের চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে গ্রামবাসীর ওপর হামলা চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। পরে তার সহযোগীরা গ্রামবাসীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার পর এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মাঝাপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকায় মাদক বিক্রির প্রতিবাদ করলেই বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হয়। কারও বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার হুমকি, আবার কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাদকবিরোধী অবস্থানকে কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক বিরোধ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। মাদক কারবারের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, কথিত পৃষ্ঠপোষকতার বিনিময়ে নিয়মিত অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা রয়েছে।
মাঝাপাড়া গ্রামের সমাজকর্মী লাভলু চৌধুরী বলেন, সুধাংশু চন্দ্র রায়কে মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বিভিন্ন সময়ে বোঝানো হয়েছে। আমরা চেয়েছি তিনি মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। তাকে ভালোভাবে জীবনযাপন করার সুযোগ দিতে আর্থিক সহযোগিতা এবং দোকান করে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও তিনি আবার মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। লাভলু চৌধুরী আরও বলেন, “মাদকের কারণে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, একটি পরিবার এবং পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।” গোপীনাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফারুক সরকার বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। একজন ব্যক্তি যে পরিচয়েরই হোক না কেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে—এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।”
রংপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু জাফর বলেন, “কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা বা সরবরাহের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে অভিযান পরিচালনায় তা সহায়ক হবে।” বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৮ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত অভিযান এবং মাদকের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। খুচরা বিক্রেতা বা মাদক বহনকারীদের আটকের পাশাপাশি মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা এবং নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকসেবীদের পুনর্বাসন এবং তরুণদের খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও প্রয়োজন। স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য, আজ একজন তরুণ মাদকে জড়ালে কাল একটি পরিবার ভেঙে পড়বে। আর এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে পুরো প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।