নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ নম্বর লোহানীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে জমে উঠতে শুরু করেছে নির্বাচনী মাঠ। সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা, ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে সরব হয়ে উঠেছে ইউনিয়নের পাড়া-মহল্লা। এরই মধ্যে তরুণ স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী রায়হান কবির মিল্টনের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দলীয় পরিচয়ের বাইরে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মিল্টন লোহানীপাড়াকে একটি ‘স্মার্ট, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত ইউনিয়ন’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর নির্বাচনী পরিকল্পনায় নাগরিক সেবা ডিজিটালাইজেশন, সরকারি বরাদ্দে স্বচ্ছতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, যুবকদের কর্মসংস্থান, কৃষকের অধিকার, রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ এবং নারী ও শিশু সুরক্ষার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মিল্টনের দাবি, নির্বাচিত হলে ইউনিয়ন পরিষদকে শুধু সনদ দেওয়া বা সরকারি সহায়তা বিতরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি আধুনিক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি।
ইশতেহারে পাঁচ খাতে বিশেষ গুরুত্ব
রায়হান কবির মিল্টনের নির্বাচনী ইশতেহারে লোহানীপাড়া ইউনিয়নের সামগ্রিক উন্নয়নে পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে নাগরিক সেবা থেকে শুরু করে কৃষি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১. দালালমুক্ত ইউনিয়ন পরিষদ, ঘরে বসে নাগরিক সেবা
নাগরিকদের ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ সমস্যা দূর করতে ইউনিয়ন পরিষদকে ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবাকেন্দ্রে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মিল্টন। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, ওয়ারিশান সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে তাঁর ইশতেহারে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে আধুনিকায়ন করে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি সেবা ও ডিজিটাল আবেদন প্রক্রিয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন তিনি।
২. সরকারি বরাদ্দে শতভাগ স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি
ইউনিয়নের উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন মিল্টন। টিআর, কাবিখা, কাবিটা, এলজিএসপি ও এডিপিসহ বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণের সামনে প্রকাশ করার কথা জানিয়েছেন তিনি। সকল অনুদান ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে সবার সামনে সঠিক ভাবে বন্টন করা হবে। যারা পাওয়ার যোগ্য তাদের কে দেয়া হবে। কোনো প্রকার বৈষম্য করা হবে না কারো সাথে। এ জন্য নিয়মিত উন্মুক্ত সভার আয়োজন করে ইউনিয়ন পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, জনগণের অর্থ জনগণের উন্নয়নেই ব্যয় হবে এবং পরিষদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও মাতৃত্বকালীন ভাতার প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনার কথাও বলা হয়েছে। কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ না রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
৩. তরুণদের কর্মসংস্থান ও মাদকমুক্ত সমাজ
লোহানীপাড়ার তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে নির্বাচনী পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে দেখছেন মিল্টন। তাঁর পরিকল্পনায় ইউনিয়ন পর্যায়ে আইটি, ফ্রিল্যান্সিং ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির কথা রয়েছে। স্থানীয় বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করে অনলাইনভিত্তিক কাজ ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তরুণদের মাদক ও অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলাধুলার সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের পাশাপাশি ইউনিয়নব্যাপী ‘চেয়ারম্যান কাপ’ টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
৪. কৃষকের অধিকার ও অবকাঠামো উন্নয়ন
কৃষির এলাকা তাই লোহানীপাড়ার উন্নয়নে কৃষকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন মিল্টন। সরকারের দেওয়া কৃষি প্রণোদনা, সার ও বীজসহ বিভিন্ন সুবিধা যেন প্রকৃত কৃষকদের হাতে পৌঁছে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।একই সঙ্গে ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের অবহেলিত কাঁচা ও ভাঙাচোরা রাস্তা সংস্কার, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের টেকসই উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে কালভার্ট নির্মাণের কথা বলা হয়েছে তাঁর ইশতেহারে। স্থানীয়দের মতে, বর্ষাকালে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাটের দুরবস্থা এবং পানি নিষ্কাশনের সমস্যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। ফলে যোগাযোগ ও জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি নির্বাচনী মাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৫. গ্রাম আদালত সক্রিয় ও নারী সুরক্ষা
সাধারণ মানুষের ছোটখাটো বিরোধ দ্রুত ও কম খরচে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গ্রাম আদালতকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে মিল্টনের। জমিজমা ও পারিবারিক বিরোধসহ স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা যাতে দ্রুত সমাধানের সুযোগ পায়, সে জন্য গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার কথা জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে, যৌতুক, নারী নির্যাতন ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রতিটি ওয়ার্ডে নারী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সচেতনতামূলক কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তরুণ ভোটারদের দৃষ্টি কর্মসংস্থান ও আধুনিক ইউনিয়নের দিকে
লোহানীপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও যোগ্য নেতৃত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। কচুয়া মাদাইখামার ও কাঁচাবাড়ী বানিয়াপাড়া এলাকার কয়েকজন প্রবীণ ভোটার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনে আসছেন। এবার তারা এমন নেতৃত্ব চান, যিনি নির্বাচনের পরও সাধারণ মানুষের পাশে থাকবেন এবং ইউনিয়নের বাস্তব সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন। তেমন প্রার্থী রায়হান কবির মিল্টন। তিনি বর্তমান চেয়ারম্যান না হয়েও যেমন জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তেমন কোনো চেয়ারম্যান প্রার্থী এখন পযন্ত কাজ করেনি। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও আধুনিক ইউনিয়ন পরিষদ, প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা ও কর্মসংস্থান নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া কয়েকজন তরুণের ভাষ্য, ইউনিয়নের উন্নয়নের পাশাপাশি যুবকদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রার্থীদের পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। যা রায়হান কবির মিল্টনের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে ভোটারদের এই মতামতই চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফলের প্রতিফলন নয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই ভোটের সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
‘লোহানীপাড়ার মানুষের ভাগ্য বদলাতে চাই’
নিজের প্রার্থিতা ও নির্বাচনী পরিকল্পনা সম্পর্কে রায়হান কবির মিল্টন বলেন, “আমি কোনো পদ-পদবির জন্য নির্বাচন করতে আসিনি। আমি লোহানীপাড়ার মানুষের সেবা করতে চাই। সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি টাকা যেন সঠিকভাবে জনগণের উন্নয়নে ব্যয় হয় এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সরকারি সহায়তা পান—এটি নিশ্চিত করাই হবে আমার প্রধান লক্ষ্য। আমি সবার সামনে ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে উন্মুক্তভাবে বিতরণ করতে চাই। আমার কোন বরাদ্দ লুকিয়ে কাউকে দেয়া হবে না যা দিবো সবগুলা সবার সামনে দিব। এতে যদি কোন বরাদ্দ সংকট পরে তাহলে আমার নিজস্ব অর্থায়নে তারপরও জনগণকে দিব। কাউকে এখান থেকে শূন্য হাতে ফিরাবো না। তিনি বলেন, লোহানীপাড়াকে বদরগঞ্জ উপজেলার একটি মডেল ইউনিয়নে পরিণত করতে চাই। নাগরিক সেবা হবে সহজ ও হয়রানিমুক্ত, পরিষদের কর্মকাণ্ড হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং ইউনিয়নের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোর উন্নয়নকে আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।” মিল্টনের ভাষ্য, জনগণ যদি তাঁকে নির্বাচিত করেন, তাহলে নির্বাচনী ইশতেহারকে শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নির্বাচনী মাঠে নতুন সমীকরণ
স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, লোহানীপাড়ার নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তরুণ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রায়হান কবির মিল্টনের মাঠে সক্রিয়তা এবং তাঁর ঘোষিত ইশতেহার নির্বাচনী আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও তরুণদের কর্মসংস্থানকে সামনে রেখে তাঁর পরিকল্পনা তরুণ ভোটারদের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। তবে নির্বাচনে কে কতটা এগিয়ে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ভোটারদের মনোভাব শেষ পর্যন্ত ভোটের দিনই সবচেয়ে স্পষ্ট হবে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হলে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।