শিরোনাম :
ক্লেমেন্টাইন ও তার বিস্ময়কর জগৎ বাংলাদেশ প্রেসক্লাব ইউএইর সভাপতিতে সংবর্ধনা ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় বাজার বণিক সমিতির নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হামলা আহত তিন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রংপুর জেলা কমিটির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত ‎জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে রংপুরে গণঅধিকার পরিষদের শ্রদ্ধাঞ্জলি ‎ ‎শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না: মুফতি সালেহ আহমাদ মুহিত ‎ মোরেলগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত  মোরেলগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জামায়াতের পথসভা হাজীগঞ্জের বেলঘরে প্রবাসী স্ত্রীর মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন

ক্লেমেন্টাইন ও তার বিস্ময়কর জগৎ

Reporter Name
Update : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬

আইয়াশা ফারহিন লিয়ানা : ১৮০৪ সালের এক শীতের রাতে, ইংল্যান্ডের হুইটবি গ্রামের কাছের একটি ছোট্ট গ্রামে ক্লেমেন্টাইন নামে এক কিশোরী বাস করত। তার চুল ছিল হালকা বেইজ রঙের—দেখলে মনে হতো, যেন তুষারের শুভ্রতার সঙ্গে মাটির কোমল রং মিশে গেছে।

ক্লেমেন্টাইনের পৃথিবী ছিল খুব ছোট। তার একমাত্র আপনজন ছিল তার অসুস্থ বাবা, হ্যারি। শীতের কনকনে রাতে, ম্লান আলোয় বাবার পাশে বসে সে প্রায়ই তার কষ্টের দিকে তাকিয়ে থাকত। বাবার অসুস্থতা তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিত।

একদিন বাবার হাত শক্ত করে ধরে ক্লেমেন্টাইন ধীরে ধীরে বলল,

বাবা, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, একদিন আমি তোমাকে অবশ্যই সুস্থ করে তুলব।”

হ্যারি মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তারপর তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে দিয়ে বললেন,

জীবন সবসময় অলৌকিক ঘটনা নিয়ে আসে না, আমার মেয়ে। তবে আমার একটাই ইচ্ছে—আমি যেন তোমাকে সুখে বাঁচতে দেখতে পারি।”

বাবার কথাগুলো ক্লেমেন্টাইনের হৃদয় ছুঁয়ে গেল। কিন্তু বাবাকে সুস্থ করার ইচ্ছা তার মনে আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।

সে শুনেছিল, শহরের প্রান্তে এক বৃদ্ধা ডাইনি বাস করত, যার কাছে নাকি পৃথিবীর সব রহস্যের উত্তর ছিল। তার নাম ছিল এলিয়েনর। লোকজন তাকে ভয় পেত, কিন্তু ক্লেমেন্টাইনের কাছে বাবাকে বাঁচানোর আশার চেয়ে বড় আর কিছু ছিল না।

সেই রাতেই সে একা রওনা দিল।

চারপাশ ছিল অন্ধকার ও নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও নেকড়ের হাহাকার শোনা যাচ্ছিল। বরফে ঢাকা সরু পথ ধরে অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়ার পর অবশেষে ক্লেমেন্টাইন এলিয়েনরের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।

বাড়িটিকে দেখেই তার বুক কেঁপে উঠল। পুরোনো বাড়িটির চারপাশ মাকড়সার জালে ঢাকা। জানালার পাশে ঝোলানো খাঁচাগুলোতে অদ্ভুত সব পাখি বসে ছিল। তাদের গুনগুন শব্দে চারপাশ আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছিল।

এলিয়েনর ক্লেমেন্টাইনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর একটি ছোট কাচের পাত্র তার হাতে তুলে দিলেন। পাত্রের ভেতরের তরলটি অদ্ভুতভাবে ঝিলমিল করছিল—মনে হচ্ছিল, যেন তার ভেতর কোনো অজানা জাদু লুকিয়ে আছে।

ক্লেমেন্টাইন পাত্রটি হাতে নিয়ে কৃতজ্ঞতায় বলল,

ধন্যবাদ। আপনার এই দয়ার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।”

এলিয়েনর শুধু রহস্যময়ভাবে হাসলেন।

ক্লেমেন্টাইন দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুদূর যেতেই হঠাৎ তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। চারপাশ যেন ঘুরতে লাগল। সে একটি বিশাল পুরোনো গাছের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।

গাছটির কাণ্ডের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিল এক অদ্ভুত বেগুনি আলো

ক্লেমেন্টাইন বিস্ময়ে ফিসফিস করে বলল,

ওই আলোটা কী?”

কৌতূহল তাকে আলোর কাছে টেনে নিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে গাছটির দিকে এগিয়ে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে—

ঝলমলে এক আলো তাকে সম্পূর্ণ নতুন এক জগতে নিয়ে গেল।

চোখ খুলতেই ক্লেমেন্টাইন দেখল, সে এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যার অস্তিত্ব সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। চারপাশে অদ্ভুত সুন্দর গাছপালা, আকাশে ঝলমলে আলো আর এমন সব প্রাণী, যাদের সে আগে কখনো দেখেনি।

সবকিছু এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো স্বপ্নের ভেতর এসে পড়েছে।

হঠাৎ পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো—

তোমার বাবা আর নেই। এখন থেকে তুমিই আমাদের একজন।”

কথাটি শুনে ক্লেমেন্টাইনের বুকটা হাহাকার করে উঠল। সে মাটিতে বসে কাঁদতে লাগল। বাবাকে হারানোর কষ্টে তার চোখের পানি থামছিল না।

ঠিক তখনই দূরে আবার একটি উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠল। আশপাশের অদ্ভুত প্রাণীগুলো তার কাছে এসে বলল,

তুমি এত দুঃখী কেন? তোমার জন্য এই জগতের দরজা খোলা। আমাদের সঙ্গে এখানেই সুখে থাকতে পারো।”

ক্লেমেন্টাইন চোখের পানি মুছে তাদের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে একটি মৃদু হাসি ফুটে উঠল। বাবাকে হারানোর কষ্ট কখনোই মুছে যাবে না—তবুও সে বুঝতে পারল, হয়তো এই অচেনা জগতেই তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

সেই রাতেই প্রাণীগুলো তাকে তাদের নতুন বাসস্থানে নিয়ে গেল।

বাড়িটি ছিল স্বচ্ছ ও ঝিকিমিকি করা কাচ দিয়ে তৈরি। চাঁদের আলো পড়লে পুরো বাড়িটা এমনভাবে ঝলমল করত, যেন কোনো পরীর রাজ্য থেকে উঠে এসেছে।

নিজের ঘরে ঢুকে ক্লেমেন্টাইন টেবিলের ওপর একটি পুরোনো, কিছুটা ছেঁড়া ছবি রাখল। ছবিটিতে ছিল সে আর তার প্রিয় বাবা হ্যারি।

কিছুক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে থেকে সে ধীরে ধীরে বলল,

আমার সবচেয়ে প্রিয় বাবা, তুমি সবসময় আমার হৃদয়ে থাকবে।”

কথাটি বলতেই তার চোখ আবার অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্লেমেন্টাইনের নতুন জীবন আনন্দে ভরে উঠল। অচেনা সেই জগতের প্রাণীগুলোই ধীরে ধীরে তার আপন হয়ে উঠল। সে নতুন বন্ধু পেল, নতুন স্বপ্ন দেখল এবং সেই বিস্ময়কর জগতের রহস্য জানতে শুরু করল।

তবুও তার হৃদয়ের এক কোণে বাবার স্মৃতি চিরকাল বেঁচে রইল।

কখনো কখনো রাতের নীরবতায় সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত—

বাবা, তুমি কি কোথাও থেকে আমাকে দেখছ?”

তারপর চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে মৃদু হাসত।

কারণ সে জানত, পৃথিবী বদলে যেতে পারে, সময় চলে যেতে পারে, মানুষ দূরে হারিয়ে যেতে পারে—

কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না।

আর সেই ভালোবাসাই ক্লেমেন্টাইনের হৃদয়ে তার বাবাকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখল।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category