রংপুর ব্যুরো: আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ)
নারীদের ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘মহিলা মার্কেট’। অথচ রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তিনটি মহিলা মার্কেটের চিত্র যেন সেই উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। অধিকাংশ দোকানে নেই প্রকৃত নারী উদ্যোক্তা। কোনো দোকানে পুরুষরা ব্যবসা করছেন, আবার কোনোটি ব্যবহার করা হচ্ছে পণ্যসামগ্রী রাখার গোডাউন হিসেবে। কয়েকটি দোকান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকলেও আদায় হচ্ছে না ভাড়া। এতে একদিকে প্রকৃত নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তিনটি মার্কেটের ৩০টি দোকানের বিপরীতে বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টাকা।
উপজেলার পারুল ইউনিয়নের দেউতি বাজার, কান্দি ইউনিয়নের কান্দির হাট এবং ছাওলা ইউনিয়নের পাওটানা হাটে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় এসব মহিলা মার্কেট নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় নারীদের ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। সরেজমিনে দেউতি মহিলা মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মোট ১২টি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে চার থেকে পাঁচটি দোকান পুরুষরা পরিচালনা করছেন। কয়েকটি দোকানে ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে বিভিন্ন মালামাল রাখা হয়েছে। ফলে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্মিত মার্কেটটি কার্যত পুরুষ ব্যবসায়ী ও মালামাল সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
মার্কেটের ‘সূজয় কসমেটিক স্টোর’ নামের একটি দোকানও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দোকানটির বরাদ্দপ্রাপ্ত শ্রীমতী মায়া রাণীর কাছে ভাড়া বকেয়া রয়েছে। স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা শাপলা বলেন, “ভাঙা ঘরে দোকান করি। রাতে চুরি-ডাকাতির ভয় থাকে। তাই অনেক সময় দোকানেই থাকতে হয়। মহিলা মার্কেটে দোকান পেলে নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা করতে পারতাম। এই মার্কেট তো আমাদের নারীদের জন্যই করা হয়েছে।” স্থানীয়দের অভিযোগ, মহিলা মার্কেটের কয়েকটি দোকান প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের মালামাল রাখার গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি মার্কেটের সামনেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দোকানপাট। এতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্মিত মার্কেটটির পরিবেশ ও মূল উদ্দেশ্য দুটিই ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, নারীদের অগ্রগতি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে সরকারের নেওয়া উদ্যোগটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। প্রকৃত নারী উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে নীতিমালা অনুযায়ী তাদের মধ্যে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান তিনি। উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনটি মহিলা মার্কেটের ৩০টি দোকানের বিপরীতে মোট ২ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টাকা ভাড়া বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে দেউতি মহিলা মার্কেটের ১২টি দোকানের বিপরীতে বকেয়া ১ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। কান্দি মহিলা মার্কেটের আটটি দোকানের বিপরীতে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং পাওটানা হাট মহিলা মার্কেটের ১০টি দোকানের বিপরীতে বকেয়া রয়েছে ৫৫ হাজার ১০০ টাকা।
বকেয়া ভাড়া ও দোকান বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে পীরগাছা উপজেলা প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান জেমি বলেন, “বকেয়া ভাড়া পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্টদের অফিস থেকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। যারা এখনো বকেয়া পরিশোধ করেননি, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” দেউতি মহিলা মার্কেটের ৩ নম্বর দোকান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্মিত স্থাপনা যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হলে সরকারি অর্থের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে মার্কেট নারীদের ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি যদি প্রকৃত নারী উদ্যোক্তাদের কাজে না আসে এবং বছরের পর বছর ভাড়া বকেয়া পড়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে? স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বকেয়া ভাড়া আদায়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দোকানগুলোর বরাদ্দ পুনর্বিবেচনা এবং নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে দোকান বরাদ্দ নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে মার্কেটগুলোকে নারীদের ব্যবসা পরিচালনার উপযোগী করে তোলারও দাবি জানিয়েছেন তারা।