নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগ; সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের মামলা ও মারধরের হুমকি
নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে উপজেলা ভূমি অফিসের সরকারি আবাসিক জমিতে বহুতল ভবনের ছাদ ঢালাই দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদুল হক আমিনের বিরুদ্ধে। গত ৩১ অক্টোবর সকালে প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে তিনি ভবনের ছাদ ঢালাই সম্পন্ন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে সরকারি জমিতে ভবন নির্মাণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের মামলা ও মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক মহলসহ সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় এমদাদুল হক আমিনকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোনাববর হোসেন। একই সঙ্গে জমির মালিকানা ও লিজসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বদরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে উপজেলা ভূমি অফিসের নিজস্ব সরকারি আবাসিক জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন এমদাদুল হক আমিন। প্রায় চার শতাংশ আয়তনের ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকা বলে স্থানীয়দের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, কৌশলে সরকারি জমি লিজ নিয়ে সেখানে স্থায়ী বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকেরা অনুসন্ধান করে সংবাদ প্রকাশ করলে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। এরপর থেকেই জমির লিজের বৈধতা, বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং সেখানে স্থায়ী ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
গত ৩১ অক্টোবর সরেজমিনে গিয়ে ওই জমিতে ভবন নির্মাণের কাজ চলার চিত্র দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে সকালে ভবনের ছাদ ঢালাই সম্পন্ন করেন এমদাদুল হক আমিন। সরকারি জমিতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও কীভাবে এমন নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলো, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, এমদাদুল হক আমিনের বাবা উপজেলা ভূমি অফিসে সরকারি সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের থাকার জন্য ঘর নির্মাণের কথা বলে তৎকালীন এক কর্মকর্তার মৌখিক অনুমতিতে সরকারি আবাসিক জমিতে অস্থায়ীভাবে একটি ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে। বাবার মৃত্যুর পর ওই জমির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন এমদাদুল হক। একপর্যায়ে ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পুরো জমি নিজের নামে লিজ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এরপর সেখানে স্থায়ী বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এর আগে সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম শাহাদাত হোসেন সরেজমিনে জমিটি পরিদর্শন করে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে ওই কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর সরকারি ছুটির সুযোগে আবারও নির্মাণকাজ শুরু করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার নিষেধ করা হলেও নির্মাণকাজ বন্ধ না হওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে ১ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোনাববর হোসেন বদরগঞ্জ পৌর ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. বকুল মিয়াকে অভিযুক্ত এমদাদুল হক আমিনকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ হাজির করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছামিউল ইসলামকে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেন। জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি ও কাগজপত্র যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত যাতে সেখানে আর কোনো নির্মাণকাজ না হয়, সে বিষয়ে নজরদারি রাখতেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোনাববর হোসেন বলেন, ১ নভেম্বর তাঁকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি উপস্থিত হননি। এ জন্য উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে তাঁকে কাগজপত্রসহ হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর জমিসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করে এ মুহূর্তে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। সবকিছু পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
বদরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছামিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তাঁকে বেশ কয়েকবার নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি নির্দেশনা অমান্য করে ভবনের ছাদ ঢালাই দিয়েছেন। তাঁর কাছে কিছু কাগজপত্র রয়েছে। আবার আমাদের অফিসের কাগজপত্রেও কিছু অসংগতি রয়েছে। এ বিষয়ে ১ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি উপস্থিত হননি। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে কোনো অনিয়ম বা অসংগতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।’