
“তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে”
নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর।।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নদীভাঙন, কৃষি সংকট ও অবকাঠামোগত দুর্ভোগ দূর করতে হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “এটি কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার। এই অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে ইনশাআল্লাহ।”
শুক্রবার বিকেলে রংপুর শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়নে আয়োজিত সুধী সমাবেশে যোগদানের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ সফরের শুরুটা আমি উত্তরবঙ্গ থেকেই করেছিলাম। নির্বাচনের পরও প্রথমে আবার রংপুরেই এসেছি। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কেন রংপুর? আমি বলবো, আমার বিবেকের জায়গা থেকেই আমি উত্তরবঙ্গকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি। কারণ এ অঞ্চল বছরের পর বছর ধরে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার।”
তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকা থেকে যত দূরের জেলা, তত বেশি বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছে। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, “ সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ দেশ পরিচালনার সময় উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পৃথিবীতে যে ভালো কাজ করবে, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
তিস্তা ও উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “তিস্তা, ধরলা ও এ অঞ্চলের অন্যান্য নদী একসময় মানুষের জীবন ও জীবিকার আশীর্বাদ ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর পলি ও বালু জমে নদীগুলো এখন প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।”
তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে নদীগুলো পানি ধারণ করতে না পেরে ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি করছে। এতে হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। আবার শুকনো মৌসুমে কৃষকেরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন না। ফলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “পানি শুধু কৃষির জন্য নয়, মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি বঞ্চিত কোনো অঞ্চল কখনো টিকে থাকতে পারে না। উত্তরবঙ্গের এই সংকট সমাধানে আমরা নির্বাচনের আগেই বলেছিলাম—সরকার গঠন করতে পারলে তিস্তার বুকেই প্রথম কোদাল পড়বে।”
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে বর্তমান সরকারের অতীত আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বর্তমান সরকারের নেতারাও একসময় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরাও ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন। এখন জনগণ শুধু বক্তব্য শুনতে চায় না, বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায়।”
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে তিনি উত্তরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্টের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তবে বাস্তবতার শতভাগের একভাগও বলা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, “এত বড় একটি অঞ্চলকে বঞ্চিত রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে—এটা কল্পনাও করা যায় না। উত্তরবঙ্গের মানুষ এ দেশের নাগরিক। তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।”
উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা উত্তরবঙ্গকে দেশের কৃষির রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বাস্তব পরিকল্পনা। সরকারি, বেসরকারি, যৌথ কিংবা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ—যেভাবেই হোক এই অঞ্চলের উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার যদি জনগণের স্বার্থে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে, তাহলে বিরোধী দল হিসেবে তারা সাধুবাদ জানাতে কৃপণতা করবে না। কারণ তাদের লক্ষ্য দলীয় উন্নতি নয়, দেশবাসীর সামগ্রিক উন্নয়ন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সমস্যা তুলে ধরতে পারেননি। তিনি বলেন, “ভোলার উন্নয়ন মানে বাংলাদেশের উন্নয়ন। সেখানে বিপুল খনিজ সম্পদ রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতির চিত্র বদলে যাবে।”
এছাড়া আইলার প্রভাবে সাতক্ষীরা, যশোর ও খুলনা অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওইসব এলাকায় হাজার হাজার একর কৃষিজমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে আছে।
নিজের জন্মভূমি সিলেটের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, “সিলেটের একটি মহাসড়কের কাজ এত দীর্ঘ সময় ধরে চলছে যে মনে হয় কেয়ামত পর্যন্তও শেষ হবে না। মানুষের দুর্ভোগ সেখানে চরমে পৌঁছেছে।
জাতীয় সংসদের কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “সংসদ কোনো তামাশার জায়গা নয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সংসদ পরিচালিত হয়। এখানে চরিত্র হনন বা কাদা ছোড়াছুড়ি নয়, জনগণের সমস্যা ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত।”
তিনি বলেন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, বেকারত্ব নিরসন ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নগুলো সংসদে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সংসদেও আগের মতো কাদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদে এ বিষয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছিল। প্রথমে সরকার আলোচনায় অনীহা দেখালেও পরে যৌথ কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেয়।
তিনি বলেন, “সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করলে দেশের বড় বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য, প্রক্টর ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “যেখানে জ্ঞানের চর্চা হওয়ার কথা, সেখানে দলীয়করণ করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, “কোনো পরিকল্পনাই চূড়ান্ত নয়। মহান আল্লাহর পরিকল্পনাই চূড়ান্ত। অতীতে যাদের সবকিছু সুসংগঠিত মনে হয়েছিল, তারাও অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়েছে।”
রংপুরের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি শহীদ আবু সাঈদ-এর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “রংপুরবাসী চিরদিন সম্মানের দাবিদার। আপনাদের সন্তান আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে আন্দোলনে সাহস জুগিয়েছিল। দেশের মানুষ তার আত্মত্যাগ কখনো ভুলবে না।”
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাদের দল নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে সরকারদলীয় প্রভাব থাকায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও দাবি করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির বিষয়েও বিরোধী দলকে অবহিত করা হয়নি।