
চেক ডিজঅনার মামলায় কারাগারে জিয়া পরিষদ নেতা ও কলেজ প্রভাষক শামীম
নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জে চাকরি দেওয়ার নামে ১৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া চেক ডিজঅনার মামলায় আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক এবং উপজেলা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুনকে। সোমবার (১ জুন) বিকেলে রংপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ (বদরগঞ্জ)-এর বিচারক সোহেল রানা তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে শিক্ষকতা ও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত শামীম আল মামুনের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে দায়ের হওয়া চেক ডিজঅনার মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে আদালত তা নাকচ করে দেন।
রংপুর জেলা আদালতের কোর্ট ইন্সপেক্টর আমিনুল ইসলাম জানান, বদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বাওচন্ডি এলাকার বাসিন্দা মো. ফয়সাল হক গত বছরের ৫ অক্টোবর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষা অধিদপ্তরের এসএসডিপি প্রকল্পে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শামীম আল মামুন, জিকরুল হক ও হাদিজ্জামান তার কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে চাকরি না হওয়ায় এবং টাকা ফেরত চাইলে অভিযুক্তরা একটি চেক প্রদান করেন। কিন্তু ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর চেকটি ডিজঅনার হয়। এরপর একাধিকবার যোগাযোগ করেও প্রতিকার না পেয়ে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।
মামলার নথি অনুযায়ী, আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার শামীম আল মামুন আদালতে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন প্রার্থনা করেন। শুনানি শেষে বিচারক তার আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শামীম আল মামুন শুধু একজন কলেজ শিক্ষকই নন, তিনি বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন জিয়া পরিষদের বদরগঞ্জ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি শিক্ষা অঙ্গনেও তার অবস্থান থাকায় কারাগারে যাওয়ার ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেন, প্রভাব খাটানো এবং বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অতীতেও তার বিরুদ্ধে একাধিকবার আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শামীম আল মামুনকে ঘিরে নতুন এই মামলার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে পুরোনো একটি সনদ জালিয়াতির অভিযোগও আবার সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর সহকারী পরিচালক তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পত্রে উল্লেখ করা হয় যে, তৃতীয় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে জাল সনদের মাধ্যমে তিনি প্রভাষক পদে নিয়োগ লাভ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ভিন্ন ব্যক্তির নাম, রোল নম্বর ও ঠিকানা ব্যবহার করে শিক্ষক নিবন্ধন সনদ তৈরি করে ২০১১ সালের ১৩ জুলাই বদরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন তিনি। বিষয়টি এনটিআরসিএর তদন্তে উঠে এলে তা নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
যদিও ওই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে নতুন করে কারাগারে যাওয়ার ঘটনায় সেই অভিযোগ আবারও জনমনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ভুপেন্দ্র নাথ সরকার বলেন,“শামীম আল মামুন আমাদের কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক। আদালতের আদেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জেনেছি। বিষয়টি যেহেতু বিচারাধীন এবং সরকারি চাকরির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই বিধি-বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
কলেজের কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি নিষ্পত্তির দাবি জানান।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত অবগত নই। সঠিক তথ্য না জেনে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। বিস্তারিত জানার পর প্রয়োজন হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে অবস্থান জানানো হবে।”
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী নেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এবং আদালতের নির্দেশে কারাগারে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
শামীম আল মামুনের কারাগারে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বদরগঞ্জজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পরিমণ্ডলে বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। অনেকেই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণ, চেক ডিজঅনার এবং পূর্বের সনদ জালিয়াতির অভিযোগ একসঙ্গে সামনে আসায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং শিক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
এদিকে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর রাখছেন এলাকাবাসী। আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ এখন সবার আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।