নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জে উপজেলা ভূমি অফিসের সরকারি আবাসিক জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের মামলা ও মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদুল হক আমিনের (জমি পরিমাপ) বিরুদ্ধে। দৈনিক যুগের আলো পত্রিকার বদরগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি আকাশ রহমানসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। এমনকি সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে জড়িত সাংবাদিকদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা এবং প্রয়োজনে আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বদরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডে উপজেলা ভূমি অফিসের নিজস্ব সরকারি আবাসিক জমিতে প্রভাবশালী এমদাদুল হক আমিনের বিরুদ্ধে কৌশলে জমি লিজ নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা সরেজমিনে অনুসন্ধান করে সংবাদ প্রকাশ করেন। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
গত ৩০ অক্টোবর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা ভূমি অফিসের পূর্ব পাশে সরকারি আবাসিক জমিতে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলমান। ইতোমধ্যে ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিকরা। এ সময় সাংবাদিকদের কাছে এমদাদুল হক আমিন দাবি করেন, তিনি জমিটি লিজ নিয়েছেন।
তবে সরকারি জমির শ্রেণি ও লিজের শর্ত নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অফিসের আবাসিক শ্রেণির সরকারি জমি কৌশলে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেখানে স্থায়ী বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকারি জমি লিজ নেওয়া হলেও সেই জমিতে কীভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, এমদাদুল হক আমিনের বাবা ভূমি অফিসে সরকারি সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের থাকার জন্য ঘর নির্মাণের কথা বলে তৎকালীন কর্মকর্তার কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে সরকারি আবাসিক জমিতে অস্থায়ীভাবে একটি ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর ওই জমির ওপর নজর দেন এমদাদুল হক। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কৌশলে পুরো জমি নিজের নামে লিজ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এরপর সম্প্রতি সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় উপজেলা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, নামে মাত্র উপজেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে অভিযানের তেমন নেই কোন অগ্রগতি আগামী ৩১ অক্টোবর ছাদ ঢালাই করবে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে লিয়াজু করে তিনি জমিটি নিজের আয়ত্তে নেয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে ততকালীন সহকারী ভূমি কমিশনার পরিদর্শন করে একপর্যায়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বদলি হয়ে যাওয়ার পর সরকারি ছুটির সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু করেন এমদাদুল হক আমিন। এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাঁরা সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের পাশাপাশি নির্মাণকাজ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানান। এবং সরকারি জায়গাটি খালি করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রশাসনকে।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছামিউল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে সরকারি জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এমদাদুল হক আমিনের উদ্দেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বদরগঞ্জ উপজেলা কর্মরত সাংবাদিকরা বলেন, তিনি আমিন (জমি পরিমাপ) সমিতির সভাপতি। তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের দেখে নেওয়া হবে। কারা কারা সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলেও হুমকি দেন তিনি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এমদাদুল হক আমিন বলেন, “আমি আমিন (জমি পরিমাপ) সমিতির সভাপতি। আপনারা আমার বিরুদ্ধে নিউজ করেছেন, আপনাদের দেখে নেব। কারা কারা এই নিউজের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। আমি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছি। থানায় মামলা করব, থানায় মামলা না নিলে আদালতে মামলা করব। সংবাদ প্রকাশের কারণে আমার মানহানি হয়েছে।”
অন্যদিকে দৈনিক যুগের আলোর বদরগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি আকাশ রহমান বলেন, “সংবাদ প্রকাশের কারণে আমাকে মামলা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আমার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে তাঁর মানহানি হয়েছে। আমার প্রকাশিত সংবাদে কোনো তথ্যগত ভুল বা ঘাটতি থাকলে তিনি চাইলে আইনগতভাবে তার প্রতিকার চাইতে পারেন। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানো ও দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা যেমন প্রশাসনের দায়িত্ব, তেমনি জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়াও কাম্য নয়। সরকারি জমির লিজের বৈধতা, জমির শ্রেণি এবং বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন সরকার বলেন, “সরকারি সম্পত্তি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। সরকারি জমি লিজ নেওয়া হলেও সেই জমিতে বিধিবহির্ভূতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। এমদাদুল হক আমিনের বিরুদ্ধে সরকারি জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের মামলা ও মারধরের হুমকির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।