নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর।।
মাদক ও জুয়ার ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত হচ্ছে যুবসমাজ। নষ্ট হচ্ছে তরুণদের ভবিষ্যৎ, বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক অশান্তি। এমন পরিস্থিতিতে মাদক ও জুয়ার আগ্রাসন থেকে যুবসমাজকে রক্ষা এবং এলাকাকে মাদকমুক্ত করার প্রত্যয়ে রংপুরের বদরগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাদকবিরোধী র্যালি ও পথসভা। ‘আসুন হাতে হাত রাখি, একসঙ্গে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই’—এ স্লোগানে আয়োজিত কর্মসূচি থেকে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল ৫টায় বদরগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম রছুল বকুলের উদ্যোগে উপজেলার লালদীঘি বাজারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
বিকেলে লালদীঘি বাজার থেকে শুরু হওয়া র্যালিটি বাজারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড় প্রদক্ষিণ করে। র্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা মাদক ও জুয়াবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত ব্যানার ও ফেস্টুন বহন করেন। তাঁদের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বাজারের আশপাশের এলাকা। ‘মাদক ধ্বংসের পথ’, ‘মাদকমুক্ত বদরগঞ্জ চাই’ এবং ‘মাদক ছেড়ে আলোকিত জীবনের পথ গড়ি’—এমন বার্তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। র্যালি শেষে অনুষ্ঠিত পথসভায় বক্তারা বলেন, মাদক ও জুয়া বর্তমানে সমাজের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের একটি অংশ এসবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় তাদের স্বাভাবিক জীবন, লেখাপড়া, কর্মসংস্থান ও পারিবারিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি পরিবার ও সমাজের সচেতন মানুষকে মাদকবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে হবে।
পথসভায় স্থানীয়দের পক্ষ থেকে লালদীঘি বাজারকে কেন্দ্র করে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তাঁদের দাবি, বাজারটি পুরো উপজেলার মাদকের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে লালদীঘি বাজার থেকেই মাদকবিরোধী আন্দোলন শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, একটি বাজার বা ইউনিয়নে সীমাবদ্ধ না রেখে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের কর্মসূচি ছড়িয়ে দিতে হবে।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সচেতন ব্যক্তিরা বলেন, মাদকের ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক জীবনে। এখনই সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ জন্য সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কার্যকর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ প্রয়োজন।
পথসভায় আয়নাল হক বলেন, “মাদক ও জুয়ার যে হারে বিস্তার ঘটছে, তাতে আগামী দিনে সমাজে ভালো মানুষ তৈরি করা এবং পড়াশোনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তরুণদের এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু মাদকবিরোধী প্রচারণা চালালেই হবে না, তরুণদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ দিতে হবে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে, যাতে তারা মাদক ও জুয়ার মতো ক্ষতিকর পথ থেকে দূরে থাকতে পারে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আহসান হাবীব বলেন, “আগে ছোট ছোট ছেলেদের কোনো কাজে ডাকলে পাওয়া যেত। এখন নেশার কারণে অনেক সময় ছেলেপেলেকে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। মাদকের কারণে তরুণদের কর্মক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে, তারা স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, সবাইকে একসঙ্গে মাদক নির্মূলে কাজ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানের প্রধান আয়োজক বদরগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম রছুল বকুল বলেন, “মাদক ও জুয়া সমাজের যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাধানগর ইউনিয়নের কোনো তরুণ যেন মাদক ও জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দলমত-নির্বিশেষে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের এ উদ্যোগ কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়। আমরা চাই, তরুণ প্রজন্ম মাদক ও জুয়ার অভিশাপ থেকে মুক্ত থাকুক। একটি সুন্দর, সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গড়ে উঠুক। এ জন্য শুধু সভা-সমাবেশ নয়, প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।”
এ সময় দলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বালু বিক্রির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। গোলাম রছুল বকুল বলেন, “দল কাউকে বালু বিক্রি করার লাইসেন্স দেয়নি। দলের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে বালু ব্যবসা করা হচ্ছে। এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় মানুষের জমিজমা ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়বে। এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।”
কর্মসূচিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিএনপি নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, হাট কমিটির সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সচেতন মানুষ অংশ নেন। বক্তারা বলেন, মাদক ও জুয়ামুক্ত সমাজ গঠন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। লালদীঘি বাজার থেকে শুরু হওয়া এ সামাজিক আন্দোলন বদরগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়বে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তাঁরা।