নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর এলাকায় শাহিনুর বেগম ওরফে ‘শাহিনুর সুন্দরী’ এবং তাঁর কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে হামলা, জমি জবরদখলের চেষ্টা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও সংঘবদ্ধভাবে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে রংপুর সদর কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর সদর কোতোয়ালি থানার তদন্ত কর্মকর্তা ওসি জহুরুল হক।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পূর্বশত্রুতার জেরে রোববার দুপুরে শাহিনুর বেগম ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অতর্কিত হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে তাঁর সৎ ভাই-বোন, বোনজামাইসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে আহতদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁদের ওপর চাপ, ভয়ভীতি ও হয়রানি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে একটি মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁরা বারবার হামলা ও হুমকির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগী শাবনাজ বেগম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান, একটি নারী নির্যাতন মামলায় তাঁদের মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সত্যের বাইরে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ। ইতিপূর্বেও তাঁরা একাধিকবার হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, শাহিনুর বেগম ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, হামলা, গালিগালাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা মামলায় হয়রানি এবং জমি দখলের চেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুবাইপ্রবাসী নওশের আলম সুমন স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় সুবিধার কথা বিবেচনা করে হরিদেবপুর ইউনিয়নের মহাদেবপুর পশ্চিমপাড়ায় একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমি কেনেন। নতুনভাবে গড়ে ওঠা ওই এলাকায় মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জমি নিয়ে বিরোধ ও দখলসংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মসজিদ নির্মাণের জন্য কেনা জমিসহ অন্যান্য জমি নিয়ে নওশের আলম সুমনের সঙ্গে শাহিনুর বেগমসহ কয়েকজনের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এ নিয়ে প্রবাসী নওশের আলম সুমন দেশে ফিরে আদালতের আশ্রয় নেন।
অভিযোগ রয়েছে, জমি সংক্রান্ত মামলার নোটিশ পাওয়ার পর একপর্যায়ে নওশের আলম সুমনের বাড়িতে রাতের আঁধারে হামলার ঘটনা ঘটে। পরে চিকিৎসা শেষে তিনি মামলা দায়ের করেন বলে জানা গেছে। অপরদিকে তাঁর বিরুদ্ধেও নারী নির্যাতনের মামলা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ওই মামলায় শাহিনুর বেগমের সৎ বোন শাবনাজ বেগমকে সাক্ষী করা হলেও তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর থেকেই তাঁর পরিবারকে নানাভাবে চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে মসজিদ নির্মাণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। লোকজন জড়ো করে হামলা, মামলা ও বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলেও তাঁদের অভিযোগ।
এদিকে, প্রবাসী নওশের আলম সুমন ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগও করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী বাদী হয়ে রংপুর সদর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া নওশের আলম সুমন বিদেশে অবস্থান করেও নিজের পরিবার ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত বছর দেশে ছুটিতে আসার পর নওশের আলম সুমনকে জমি সংক্রান্ত মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়। তিনি সেই চাপ উপেক্ষা করলে তাঁর বিরুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে লোকজন জড়ো করার চেষ্টা করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের জুন মাসে পাগলাপীরের আলোয়াকুড়ি এলাকায় নওশের আলম সুমনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রংপুর সদর এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
পরে যৌথবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আগুন লাগানোর অভিযোগের বিষয়ে কয়েকজনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আদালতের রায় নওশের আলম সুমনের পক্ষে যাওয়ার পরও রায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি বলে ভুক্তভোগী পক্ষ অভিযোগ করেছে। তাঁদের দাবি, মসজিদের জমির বিপরীত পাশে জবরদখল করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলা, ভয়ভীতি, মামলা ও গুজব ছড়িয়ে লোকজনকে উত্তেজিত করার অভিযোগে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে হামলা, জমি দখল, ভয়ভীতি ও অন্যান্য অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে রংপুর সদর কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) জহুরুল হক বলেন, “হরিদেবপুরের মহাদেবপুর এলাকায় মারামারির ঘটনায় একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই দিন অভিযোগটি তদন্তের জন্য এনডোর্স করা হয়েছে। তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”