নিজস্ব প্রতিবেদক, কাউনিয়া (রংপুর)।।
রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ পৌরসভায় অবস্থিত ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধুমেরকুটি হায়দারিয়া দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘ ৮৪ বছরের গৌরবময় ইতিহাস ম্লান হতে বসেছে চরম প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং একশ্রেণির শিক্ষকের দায়িত্বহীনতার কারণে। একসময় অঞ্চলের মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত এই বিদ্যাপীঠটি এখন অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও সচেতন মহল। তাদের দাবি, জবাবদিহিতাহীন ম্যানেজিং কমিটি, প্রধান শিক্ষকের নানা অনিয়ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অভিভাবকদের পক্ষ থেকে ওঠা সবচেয়ে বড় এবং প্রধান অভিযোগটি হলো বিদ্যালয়ের লাগামহীন অর্থ আদায়কে কেন্দ্র করে। শিক্ষা বোর্ড ও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়গুলোতে ফরম পূরণ, ভর্তি কিংবা সেশন ফি নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও, এই বিদ্যালয়ে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতি বছর অষ্টম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় বোর্ড নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। এছাড়া ‘উন্নয়ন’-এর নামে প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোনো অভিভাবক এই অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের প্রতিবাদ করলে বা অসমর্থতা প্রকাশ করলে, শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র আটকে রাখা কিংবা শ্রেণীকক্ষে মানসিক হয়রানির শিকার হতে হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্রতি বছর এই খাতের মাধ্যমে সংগৃহীত লাখ লাখ টাকার কোনো অডিট বা ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব সাধারণ অভিভাবক তো দূর—অনেক সাধারণ শিক্ষকের কাছেও থাকে নাই।
বিদ্যালয়টি পরিচালনার জন্য যে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়, তা নিয়েও এলাকাবাসী খাদেমুল আরিফ পলাশ বলেন, এই বিদ্যালয়ে নানা ধরনের অনিয়ম হচ্ছে দেখার কেউ নেই। তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে দাবি করেন, এটি প্রকৃতপক্ষে একটি ‘পকেট কমিটি’, যা সাধারণ অভিভাবকদের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে স্থানীয় প্রভাবশালী ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গঠন করা হয়।
এই কমিটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়ায় অতীতে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শূন্য পদে (যেমন: অফিস সহকারী, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী) লোকবল নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। যোগ্যতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সাধারণ পরিবারের যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে, পর্দার আড়ালে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে এলাকায় জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। পাশাপাশি এডহক কমিটি গঠনে নিজস্ব লোকজন দিয়ে কমিটি করার পায়তারা চালাচ্ছে প্রধান শিক্ষক। এই ধরনের অনৈতিক নিয়োগের ফলে একদিকে যেমন যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বিদ্যালয়টির একাডেমিক পরিবেশ এখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে বলে দাবি বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের।
সাধারণ এবং দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার এই বাণিজ্যিকীকরণের কারণে দিন দিন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ কমছে এবং ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শত বছরের পুরোনো এই বিদ্যাপীঠের এমন ধস নামলেও যেন দেখার কেউ নেই। প্রধান শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বরাবর বিভিন্ন সময়ে মৌখিক ও লিখিতভাবে অভিযোগ জানানো হলেও, তারা অদৃশ্য কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। উল্টো যেকোনো যৌক্তিক দাবি বা অনিয়মের কথা তুললে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এ বিষয়ে ধুমেরকুটি হায়দারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়, তাই তার এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এমতাবস্থায়, ধুমেরকুটি হারাগাছ এলাকার সচেতন নাগরিক ও সাধারণ অভিভাবক সমাজ আর বসে থাকতে রাজি নন। তাদের স্পষ্ট দাবি—অবিলম্বে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), জেলা শিক্ষা অফিসার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। যে সকল শিক্ষক এসব অনিয়মের সাথে জড়িত সে সকল শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্রুত এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা না হলে, স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে কঠোর আন্দোলনে নামার আল্টিমেটাম দিয়েছেন ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা।