নিজস্ব প্রতিবেদক,রংপুর।।
দুই হাত আছে, কিন্তু নেই হাতের আঙুল। তবুও থেমে থাকেনি স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলা। হাতের পরিবর্তে পা দিয়ে লিখেই শৈশব থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশোনা। শত প্রতিকূলতা আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৫০ অর্জন করেছেন রংপুরের মেধাবী শিক্ষার্থী কলি রানী। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনই নয়, জীবনে আরও বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করাই এখন তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
কলি রানী রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের মেয়ে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। জন্ম থেকেই দুই হাতে আঙুল না থাকায় স্বাভাবিকভাবে কলম ধরে লেখার সুযোগ হয়নি তার। তবে এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে লিখে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান কলি। এরপর জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে মায়ের স্নেহ, সাহস ও অনুপ্রেরণায় এগিয়ে যেতে থাকেন স্বপ্নপূরণের পথে।
কাউনিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৩.৫০ অর্জন করেছেন কলি। তার এ সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তার এমন অর্জন স্থানীয়দের কাছে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
কলির মা রূপালী রানী বলেন, জন্ম থেকেই মেয়ের দুই হাতে আঙুল নেই। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ। কখনোই সে নিজের প্রতিবন্ধকতাকে অজুহাত হিসেবে দেখেনি। পা দিয়ে লিখেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা, সহপাঠীদের আন্তরিকতা ও শিক্ষকদের উৎসাহে আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে। মেয়ের এই সাফল্যে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তার স্বপ্ন, মেয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেবে এবং মানুষের সেবা করবে।
শুধু পড়াশোনাতেই নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বেশ দক্ষ কলি। ডান পা দিয়েই অনায়াসে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার পরিচালনা করতে পারেন তিনি। পাশাপাশি তার রয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতিভাও। সুরেলা কণ্ঠে গান গাইতে ভালোবাসেন কলি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে ইতোমধ্যে পুরস্কার ও প্রশংসা অর্জন করেছেন। পড়াশোনা, প্রযুক্তি ব্যবহার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই নিজের সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন তিনি।
কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কলি সবার সঙ্গে বসে পরীক্ষা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। তার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে ৩০২ নম্বর কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গেই পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, কলির মধ্যে অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস রয়েছে। পা দিয়ে লিখেই সে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সব পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। এর আগেও পা দিয়ে লিখে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সে। এবার এইচএসসি পরীক্ষায়ও সাফল্য অর্জন করেছে। তার এই অদম্য প্রচেষ্টা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
নিজের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কলি রানী বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তিনি কখনো নিজেকে অসহায় মনে করেন না। জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যেতে চান। উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করতে চান। তার ভাষায়, ‘আমি প্রমাণ করতে চাই, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে পারে না। চেষ্টা, পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবল থাকলে সব বাধা অতিক্রম করে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।’
কলি রানীর গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফলের গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দুই হাতে আঙুল না থাকলেও পা দিয়ে লিখে তিনি যেভাবে শিক্ষার আলোয় নিজেকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তা সমাজের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা। তার স্বপ্ন পূরণের পথে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতা পেলে একদিন তিনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবেন—এমন প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।