রংপুর ব্যুরো: আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ)
রংপুর নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করে হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রায় ১৪ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘পল্লীবন্ধু এইচ এম এরশাদ হকার্স মার্কেট’। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগের সুফল মেলেনি। হকারদের জন্য নির্মিত মার্কেটটি এখন অনেকটাই হকারশূন্য। বন্ধ পড়ে আছে অধিকাংশ দোকান। কোথাও গোডাউন, কোথাও গড়ে উঠেছে ছোট কারখানা। অন্যদিকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত দখল করে আগের মতোই চলছে হকারদের ব্যবসা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত এই মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ ও সুবিধা আসলে কার হাতে?
নগরীর রাধাবল্লভ মৌজার ইসলামপুর হনুমানতলা এলাকায় দুই একর ২৪ শতক জমির ওপর নির্মিত মার্কেটটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসার সুযোগ করে দেওয়া। পাশাপাশি যানজট কমানো এবং নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু দীর্ঘ ১৪ বছরেও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, দোকান বরাদ্দে অনিয়ম, অবৈধ দখল, ভাড়া আদায়ে উদাসীনতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পটি।
সম্প্রতি যানজট নিরসন ও পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে রংপুর সিটি করপোরেশন সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান শুরু করেছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও স্থায়ী সমাধান নিয়ে রয়েছে সংশয়। সচেতন নাগরিকদের দাবি, ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ করা প্রকৃত হকারদের তালিকা তৈরি করে হকার্স মার্কেটে পুনর্বাসন করতে হবে।
সরেজমিনে মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, সামনের অংশের কয়েকটি দোকানে কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা চলছে। তবে ভেতরের অধিকাংশ দোকান বন্ধ। কিছু দোকান গোডাউন ও ছোট কারখানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হকারদের জন্য নির্ধারিত খোলা জায়গা ও সেডগুলোও পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। সন্ধ্যার পর মার্কেট এলাকায় মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডা বসার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি কারখানার মালিক জানান, এখানে হকারদের ব্যবসা করার কথা থাকলেও তারা আসেননি। ফলে বাইরের লোকজন কম টাকায় দোকান কিনে বা ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন। তার অভিযোগ, অনেক সামর্থ্যবান ব্যবসায়ীও ফুটপাতে দোকান বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কেউ নিজে, আবার কেউ ভাড়া করা লোক দিয়ে ফুটপাত দখলে রাখছেন।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে তৎকালীন রংপুর পৌরসভার উদ্যোগে মার্কেটটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১২ সালে উদ্বোধন করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। মোট এক হাজার ৬১টি দোকানের মধ্যে ৭৪৭টি বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি দোকানের জন্য অফেরতযোগ্য দেড় লাখ টাকা জামানত এবং মাসিক ৪৫০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, শুরু থেকেই নিয়মিত ভাড়া আদায় হয়নি। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে সিটি করপোরেশন।
মার্কেটে ছয়টি দোকান বরাদ্দ নেওয়া গোমস্তাপাড়ার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ব্যবসার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় এখানে ব্যবসা করতে পারেননি। দোকানের ভাড়া আদায়ের জন্যও কেউ যোগাযোগ করেননি। ফলে দোকানগুলো বন্ধ পড়ে রয়েছে।
মার্কেটের সভাপতি মো. রিপন সিকদার বলেন, দোকান বরাদ্দ নিয়ে অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেউ জমিজমা বিক্রি করে দোকান নিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবসার পরিবেশ না থাকায় অনেকে এখন বেকার। সাবেক মেয়র মার্কেটটি ছয়তলা করা এবং সামনের জায়গা উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। বর্তমান প্রশাসকের সঙ্গে উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত সংস্কার ও মার্কেটটি চালুর দাবি জানান তিনি।
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, হকার্স মার্কেটটি পুরোপুরি চালু করা গেলে নগরীর সড়কে হকারদের চাপ কমবে। প্রকৃত হকারদের ডাটাবেজ তৈরি করে স্মার্ট আইডি কার্ড দেওয়া প্রয়োজন। এতে নতুন করে কেউ ফুটপাত দখল করার সুযোগ পাবে না।
সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রুবেল রানা বলেন, বৈধভাবে দোকান বরাদ্দ পাওয়া ব্যবসায়ী ও মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনা করে মার্কেটটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভাড়া না দিয়ে অবৈধভাবে দোকান দখলে রাখা ব্যক্তিদের দোকান ছেড়ে দিতে বলা হবে। পাশাপাশি অব্যবহৃত সেড পরিষ্কার এবং উন্নয়নকাজের বিষয়েও প্রকৌশল শাখা কাজ করছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন-নবী চৌধুরী বলেন, হকার্স মার্কেটটি পরিদর্শন করা হয়েছে। এটি চালু ও হকারদের পুনর্বাসনে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সময় ও সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো অবৈধ দখল ও স্থাপনা রাখা হবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর রংপুর জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। হকারদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে প্রশাসন ও পুলিশের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অবৈধ পার্কিং বন্ধ এবং বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হকার্স মার্কেটটি আর অবহেলায় পড়ে থাকবে না। প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দোকান বরাদ্দের স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করে মার্কেটটি সচল করা হবে। তাহলেই ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ স্থায়ী রূপ পাবে এবং নগরবাসীর চলাচলে ফিরবে স্বস্তি।