নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর।।
রংপুরের বদরগঞ্জে উপজেলা ভূমি অফিসের সরকারি আবাসিক জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর পূর্বানুমতি ছাড়া বিরোধপূর্ণ ওই সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি ও বাড়িতে জনসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত জরুরি নোটিশ জারির পর সোমবার (২ নভেম্বর) স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদুল হক আমিনের বাড়ির গেটে নোটিশটি ঝুলিয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এর আগে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সরকারি জমিতে নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ছাদ ঢালাই করার অভিযোগ ওঠে এমদাদুল হক আমিনের বিরুদ্ধে। গত ৩১ অক্টোবর সকালে তিনি ভবনের ছাদ ঢালাই সম্পন্ন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি জমিতে ভবন নির্মাণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের মামলা ও মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে বদরগঞ্জজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
উপজেলা প্রশাসনের জারি করা জরুরি নোটিশে বলা হয়েছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি), বদরগঞ্জের পূর্বানুমতি ছাড়া নির্দিষ্ট নালিশীভুক্ত সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি ও বাড়িতে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বদরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে উপজেলা ভূমি অফিসের নিজস্ব সরকারি আবাসিক জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদুল হক আমিন। প্রায় চার শতাংশ আয়তনের ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকা বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি জমি লিজ নেওয়ার পর সেখানে স্থায়ী বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন তিনি। তবে জমির লিজের বৈধতা, বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং স্থায়ী ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকেরা অনুসন্ধান করে সংবাদ প্রকাশ করলে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। এরপর থেকেই জমির মালিকানা ও লিজসংক্রান্ত বৈধতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সংবাদ প্রকাশের জেরে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের মামলা ও মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে।
গত ৩১ অক্টোবর সরেজমিনে ওই জমিতে নির্মাণকাজ চলার চিত্র দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে সকালে ভবনের ছাদ ঢালাই সম্পন্ন করা হয়। সরকারি জমি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া এবং প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার মধ্যেই কীভাবে নির্মাণকাজ চলল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকেরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, এমদাদুল হক আমিনের বাবা উপজেলা ভূমি অফিসে সরকারি সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের থাকার জন্য ঘর নির্মাণের কথা বলে তৎকালীন এক কর্মকর্তার মৌখিক অনুমতিতে সরকারি আবাসিক জমিতে অস্থায়ীভাবে একটি ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে। বাবার মৃত্যুর পর ওই জমির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন এমদাদুল হক। একপর্যায়ে ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পুরো জমি নিজের নামে লিজ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এর আগে সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম শাহাদাত হোসেন সরেজমিনে জমিটি পরিদর্শন করে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে ওই কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর সরকারি ছুটির সুযোগে আবারও নির্মাণকাজ শুরু করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ ঘটনায় গত ১ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোনাববর হোসেন বদরগঞ্জ পৌর ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. বকুল মিয়াকে অভিযুক্ত এমদাদুল হক আমিনকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তাঁর কার্যালয়ে হাজির করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছামিউল ইসলামকে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। জমির মালিকানা ও লিজসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোনাববর হোসেন বলেন, “গত ১ নভেম্বর তাঁকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি উপস্থিত হননি। এ জন্য উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে তাঁকে কাগজপত্রসহ হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জমিসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করে এ মুহূর্তে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। সবকিছু পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
বদরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছামিউল ইসলাম বলেন, “আমরা তাঁকে বেশ কয়েকবার নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি নির্দেশনা অমান্য করে ভবনের ছাদ ঢালাই দিয়েছেন। তাঁর কাছে কিছু কাগজপত্র রয়েছে। আবার আমাদের অফিসের কাগজপত্রেও কিছু অসংগতি রয়েছে। এ বিষয়ে ১ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি উপস্থিত হননি। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে কোনো অনিয়ম বা অসংগতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ির গেটে জরুরি নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এখন স্থানীয়দের নজর জমির মালিকানা, লিজের বৈধতা এবং সরকারি জমিতে নির্মিত ভবনের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।