রংপুর ব্যুরো: আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ)
সমাজের প্রচলিত রীতিতে অতিথির আসনে বসেন প্রভাবশালী কিংবা সচ্ছল ব্যক্তিরা। তবে সেই চেনা চিত্রের বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রংপুরের বদরগঞ্জের উন্নয়নকর্মী মোরশেদুল হক। তাঁর আয়োজনে অনুষ্ঠানের সভাপতি হয়েছেন একজন ভ্যানচালক। বিশেষ অতিথির মর্যাদা পেয়েছেন জুতা মেরামতকারী, ঝালমুড়ি বিক্রেতা ও মসজিদের খাদেম। তাঁদের ঘিরেই বসেছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী দাড়িয়াবান্ধা খেলার আসর। আয়োজনটি শুধু খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; হয়ে উঠেছে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি সম্মান, মানবিকতা ও সামাজিক সচেতনতার এক অনন্য বার্তা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেলে বদরগঞ্জ উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মানসিংহপুর অফিসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ খেলার আয়োজন করা হয়। ‘মাদককে না বলি, বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গড়ি’—এ স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্থানীয় মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ঐতিহ্যবাহী খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে খেলাধুলার পাশাপাশি ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক সচেতনতার বার্তা।
অনুষ্ঠানে সভাপতির আসনে বসেন ভ্যানচালক মো. সিদ্দিক আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জুতা মেরামতকারী বুদারু রায়, ঝালমুড়ি বিক্রেতা আব্দুল মতিন সরকার এবং মুন্সিপাড়া মসজিদের খাদেম এজাবুল মুন্সি। সমাজের যাঁরা প্রতিদিন পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন, অথচ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সচরাচর অতিথির মর্যাদা পান না, তাঁদেরই সামনে এনে সম্মানিত করা হয় এ আয়োজনে। এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনুষ্ঠানের সভাপতি মো. সিদ্দিক আলী। জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব ও সম্মান পেয়ে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন।
সিদ্দিক আলী বলেন, “আমার জীবনে কখনো কোথাও অতিথি হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। আজকে অতিথির আসনে বসতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। আমাকে যে সম্মান দেওয়া হয়েছে, তা আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। এমন সম্মান পেয়ে আমি আনন্দিত ও গর্বিত।”
আয়োজক ও সমাজকর্মী মোরশেদুল হক বলেন, “সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের অতিথির আসনে বসাতে পেরে আমি গর্ববোধ করছি। সমাজে প্রত্যেক মানুষেরই সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। পেশা কিংবা আর্থিক অবস্থান দিয়ে কাউকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আমি চেয়েছি, যাঁরা প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁরাও যেন সামাজিক অনুষ্ঠানে সম্মানিত হওয়ার সুযোগ পান।”
তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ সমাজের একটি বড় ব্যাধি। এটি শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ, শিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে মাদক ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এসব সামাজিক সমস্যা প্রতিরোধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সেই চিন্তা থেকেই ঐতিহ্যবাহী দাড়িয়াবান্ধা খেলার আয়োজনের মাধ্যমে মাদকবিরোধী ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
মোরশেদুল হকের মতে, খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করারও একটি কার্যকর উপায়। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে দেশীয় খেলাধুলার চর্চা বাড়ানো গেলে তরুণদের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যও তুলে ধরা সম্ভব হবে।
দাড়িয়াবান্ধা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আধুনিক বিনোদনের প্রসারে এ ধরনের দেশীয় খেলার চর্চা অনেক জায়গায় কমে গেলেও স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজনের মাধ্যমে আবারও তা জনপ্রিয় করে তোলার সুযোগ রয়েছে। বদরগঞ্জের এ আয়োজন সেই সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে।
তবে আয়োজনটির সবচেয়ে বড় তাৎপর্য ছিল সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সম্মানের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। একজন ভ্যানচালককে সভাপতির আসনে বসানো কিংবা জুতা মেরামতকারী ও ঝালমুড়ি বিক্রেতাকে অতিথির মর্যাদা দেওয়া—এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর পেশা কিংবা আর্থিক সামর্থ্য নয়; বরং তাঁর মানবিক মর্যাদা।
খেলাধুলার আনন্দের সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা এবং অবহেলিত মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এমন সমন্বিত উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। মোরশেদুল হকের এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বড় আয়োজনের চেয়ে প্রয়োজন আন্তরিকতা, সচেতনতা ও মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান জানানোর মানসিকতা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বদরগঞ্জে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি হাসান জাহিদ সরকার, তিনি জনগনের উদ্দেশ্য বলেন, কেউ যদি এলাকায় মাদক ক্রয় বিক্রয় করে তাহলে তাদের খোঁজ থানায় দিবেন তাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। মাদক সমাজের শত্রু দেশের শত্রু মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে সোচ্ছার হতে হবে। পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে সবসময় কাজ করছে।