রংপুর ব্যুরো: আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ)
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ১৫নং লোহানীপাড়া ইউনিয়নে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য কিনতে এসে খালি হাতে বাড়ি ফিরেছেন অর্ধশতাধিক কার্ডধারী। আগের রাতে মাইকিং করে পণ্য বিক্রির সময়সূচি জানানো হলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই পণ্য শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারের ভর্তুকিমূল্যের পণ্য কিনতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তা না পাওয়ায় বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) লোহানীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে টিসিবির পণ্য বিক্রির সময় এ ঘটনা ঘটে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ অক্টোবর রাতে ইউনিয়নজুড়ে মাইকিং করে জানানো হয়, ২০ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হবে। এ ঘোষণায় আশ্বস্ত হয়ে পরদিন সকাল থেকেই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে কার্ডধারীরা ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে আসতে থাকেন। তাঁদের অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে এসে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই ডিলারদের কাছে থাকা পণ্য শেষ হয়ে যায়। ফলে অর্ধশতাধিক কার্ডধারী পণ্য না পেয়েই বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে পণ্য বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হলে কার্ডধারীদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পণ্যের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। কিন্তু পণ্য না থাকায় তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মানুষের কাছে টিসিবির পণ্য সংসারের ব্যয় সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। সেই পণ্য কিনতে এসে খালি হাতে ফেরায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে টিসিবির ডিলার ‘শান্তি সারবিতান’-এর প্রতিনিধি সনজিত কুমার বলেন, তিনি গত রোববার ২১ জন কার্ডধারীর কাছে পণ্য বিক্রি করেছেন। তাঁর দাবি, অ্যাপস-সংক্রান্ত জটিলতা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে সব কার্ডধারীকে পণ্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ‘অন্তরা ট্রেডার্স’-এর প্রতিনিধির বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সিও জিয়া বলেন, টিসিবির পণ্য বিক্রির সূচি বা ক্যালেন্ডার তৈরি করে দেওয়াই ছিল তাঁর দায়িত্ব। তিনি দাবি করেন, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে। ক্যালেন্ডারে সরকারি ছুটির দিনে টিসিবির পণ্য বিক্রির সুযোগ না থাকার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।তিনি আরও বলেন, “মঙ্গলবার সরকারি ছুটির দিন ছিল। ওই দিন টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হবে, তা আমাকে জানানো হয়নি। ডিলাররা তাঁদের চাহিদার তুলনায় কম পণ্যের ব্যবস্থা করেছেন। এ কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর দায় ডিলারদের।” তবে ডিলার প্রতিনিধির পক্ষ থেকে অ্যাপসের জটিলতার কথা বলা হলেও পণ্য না পাওয়া কার্ডধারীরা এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাঁদের প্রশ্ন, প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে যদি পণ্য বিতরণে বাধা সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে আগেভাগে তা জানানো হলো না কেন? একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কার্ডধারীকে পণ্য দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। টিসিবির পণ্য না পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজু মিয়া, হুমায়ুন কবির, আজমা খাতুন, জাহানারা খাতুন, নাজমা লোহানী, লাভিন বাবু, মজমুল হক, মজমুল ইসলাম, সহিদার রহমান ও ফরহাদ আলীসহ প্রায় ৬০ জন এখনো পন্য পায়নি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন সুবিধাভোগী বলেন, “আমরা নিম্ন আয়ের পরিবারের মানুষ। টিসিবির পণ্য পেলে সংসারের খরচ কিছুটা কমে। মাইকিং করে পণ্য বিক্রির কথা জানানো হয়েছিল বলেই আমরা এসেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পণ্য পাইনি। অ্যাপসে সমস্যা হলে আমাদের পণ্য তো শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। আগে এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি।” তাঁদের অভিযোগ, ডিলারদের অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার কারণে সাধারণ মানুষ সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রতিও মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা। বিশেষ করে এ ঘটনার প্রভাব লোহানীপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির ওপরও পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন কয়েকজন সুবিধাভোগী।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোনাব্বর আলী বলেন, “বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। ঘটনার সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয়দের দাবি, টিসিবির পণ্য বিতরণে কী কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যেসব কার্ডধারী নির্ধারিত দিনে পণ্য পাননি, তাঁদের জন্য দ্রুত পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে নিম্ন আয়ের মানুষ সরকারি এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন।