দুই মন্দির সভাপতির দাবি—পূজা হয়নি, স্বাক্ষরও দেননি।
রংপুর ব্যুরো: আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ)
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় পূজা অনুষ্ঠিত না হলেও পূজামণ্ডপের নামে সরকারি জিআর (জেনারেল রিলিফ) চাল বরাদ্দ ও উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের দুটি মন্দিরকে কেন্দ্র করে এ অভিযোগ সামনে আসার পর সরকারি সহায়তা বিতরণের স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মাইদুল ইসলাম এবং পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার রায়। সংশ্লিষ্ট দুই মন্দিরের সভাপতির দাবি, তাঁদের মন্দিরে পূজা না হলেও বরাদ্দের চাল উত্তোলন করা হয়েছে। এমনকি উত্তোলন করা চাল বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার। তবে চাল বরাদ্দ ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের ১১ অক্টোবর বরাদ্দ তালিকায় দেখা যায়, বেতগাড়ি ইউনিয়নের ২১টি পূজামণ্ডপের প্রতিটির নামে ৬০০ কেজি করে মোট ১২ হাজার ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। তালিকায় রয়েছে পুটিমারী পশ্চিমপাড়া দুর্গা মন্দির এবং পশ্চিম খাপড়িখাল সার্বজনীন কালী ও দোন্দোরা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের নাম। প্রতিটি মন্দিরের বিপরীতে বরাদ্দের পরিমাণ ৬০০ কেজি। কিন্তু তালিকাভুক্ত দুটি মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত না হওয়ার অভিযোগ ওঠায় বরাদ্দের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পূজা না হলে কোন তথ্যের ভিত্তিতে এসব মন্দিরের নামে চাল বরাদ্দ দেওয়া হলো, কারা চাল উত্তোলন করলেন এবং উত্তোলিত চাল কোথায় গেল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বরাদ্দের আবেদন, অনুমোদনপত্র, চাল উত্তোলনের রসিদ এবং বিতরণসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
‘আমি কিছুই জানি না, কোনো স্বাক্ষর করিনি’
পুটিমারী পশ্চিমপাড়া দুর্গা মন্দিরের সভাপতি স্বাধীন চন্দ্র রায় বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমি কোনো স্বাক্ষর করিনি। পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তপন চন্দ্র এসব কাজ করেছেন। পরে জানতে পেরেছি।” মন্দির সভাপতির এ বক্তব্যে বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় তাঁর সম্মতি ও স্বাক্ষর ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর দাবি সত্য হলে সংশ্লিষ্ট মন্দিরের নামে বরাদ্দ ও চাল উত্তোলনের ক্ষেত্রে কী ধরনের নথি ব্যবহার করা হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চাল উত্তোলনের অনুমোদন কে দিয়েছেন এবং উত্তোলনের সময় কী কী কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। পশ্চিম খাপড়িখাল সার্বজনীন কালী ও দুর্গা মন্দিরের সভাপতি পরিমল চন্দ্র রায় বলেন, “২০২৫ সাল থেকে এখানে কোনো পূজা উদ্যাপন করা হয়নি। এবারও হয়নি। কে বা কারা এসব কাজ করেছেন, তাঁদের শাস্তি চাই।” দুই মন্দিরের সভাপতির বক্তব্যে পূজা আয়োজনের বাস্তব পরিস্থিতি এবং সরকারি বরাদ্দের তথ্যের মধ্যে অসংগতির অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে অনিয়মের ধরন, চাল উত্তোলনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং চাল বিক্রির অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের জবাবে পিআইওর মন্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে বেলা ১২টার দিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে পিআইও মাইদুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। পরে দুপুর ১২টার পর তিনি কার্যালয়ে আসেন। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা কোনো বিষয় না, এগুলো অটোমেটিক ঠিক হবে।” তাঁর এ মন্তব্যের পর অভিযোগের গুরুত্ব এবং সরকারি সহায়তা বিতরণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জিআর চাল বরাদ্দ ও বিতরণ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।অন্যদিকে, পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার রায় অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “এটা ভুল হয়েছে, আমরা ফেরত দেব।” তাঁর এ বক্তব্যে বরাদ্দের চাল ফেরত দেওয়ার প্রসঙ্গ সামনে এলেও কীভাবে চাল উত্তোলন করা হয়েছে, কতটুকু চাল কোথায় রয়েছে এবং তা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া কখন সম্পন্ন হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তদন্তে অনিয়ম মিললে ব্যবস্থা: ইউএনও
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, “বিষয়টি জানার পর আমরা পর্যবেক্ষণ করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। এ বিষয়ে পূজা উদ্যাপন কমিটিকে তলব করা হয়েছে। বরাদ্দ ও চাল উত্তোলনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে কারও অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্রশাসনের এ বক্তব্যের পর অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং দায়ীদের ভূমিকা নির্ধারণের বিষয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তে বরাদ্দের তালিকা, মন্দিরের প্রকৃত কার্যক্রম, আবেদনপত্র, স্বাক্ষর, চাল উত্তোলনের রসিদ ও বিতরণসংক্রান্ত হিসাব মিলিয়ে দেখা হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। সরকারি ত্রাণ ও সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা এবং বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পূজা অনুষ্ঠিত না হওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মন্দিরের নামে চাল বরাদ্দ ও উত্তোলনের ঘটনা সত্য হলে তা সরকারি সহায়তা ব্যবস্থাপনার গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এখন প্রশাসনিক তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, উত্তোলন করা চাল ফেরত দেওয়া হয় কি না এবং কারও বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মেলে কি না সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।