রংপুর ব্যুরো: আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ)
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্যে হঠাৎ নেমে এলো শোকের ছায়া। রংপুরের বদরগঞ্জে দুর্গামন্দিরে আরতি দিতে গিয়ে অর্চনা রানী (নাম) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। রোববার (১৮ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের নামাপাড়া দুর্গামন্দিরে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। অর্চনা রানী ওই গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় পূজারিদের মধ্যে শোকের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাতে নামাপাড়া দুর্গামন্দিরে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা চলছিল। মন্দিরে উপস্থিত ছিলেন অর্চনা রানীও। তিনি দর্শকসারিতে বসে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আরতি উপভোগ করছিলেন। একপর্যায়ে বাদ্যযন্ত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভালো করে বাজাও, আমি গান করব, আরতি দেব, নাচব।’ এরপর দর্শকসারি থেকে উঠে দুর্গাপ্রতিমার সামনে আরতি দিতে যান তিনি।
আরতি দেওয়ার সময় একপাক ঘুরতেই হঠাৎ মাথা ঘুরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অর্চনা রানী। মুহূর্তেই মন্দিরের উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। উপস্থিত লোকজন দ্রুত তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অর্চনা রানীর প্রতিবেশী মালা রানী বলেন, ‘অর্চনা রানী মন্দিরে বসে আরতি উপভোগ করছিলেন। একপর্যায়ে বাদ্যযন্ত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ভালো করে বাজাও। আমি গান করব, আরতি দেব, নাচব।” এরপর আরতি দিতে গিয়ে একপাক ঘুরতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অর্চনা।’ একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন আরেক প্রতিবেশী জগদীশ রায়। তিনি জানান, অর্চনা রানী প্রতিবছর দুর্গোৎসবে আরতি দিতেন। পূজার এই আয়োজনে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। তবে এবার আরতি দিতে গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতি হবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
অর্চনা রানীর স্বামী গোপাল চন্দ্র সরকার জানান, তাঁর স্ত্রীর উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা ছিল। এ ছাড়া ঘটনার দিন তিনি সারা দিন উপবাস করেছিলেন। তবে ঠিক কী কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা চিকিৎসাগতভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অর্চনা রানী ও গোপাল চন্দ্র সরকারের চার মেয়ে। তাঁদের বড় তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে স্বপ্না রানী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি গোপাল চন্দ্র সরকার স্থানীয় একটি বাজারের হোটেলে কাজ করেন। পরিবারের এমন দুঃসময়ে অর্চনা রানীর আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে। নামাপাড়া দুর্গামন্দির কমিটির সভাপতি নিত্যেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, দুর্গোৎসব চলাকালে আরতি দেওয়ার সময় অর্চনা রানী হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে মন্দিরের উৎসবের আনন্দ শোকে পরিণত হয়। ঘটনার পর ওই রাতে মন্দিরে আর কোনো পূজা-অর্চনা অনুষ্ঠিত হয়নি। সোমবার দুপুরের আগে তাঁর মরদেহ সমাধিস্থ করার কথা রয়েছে।
বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, উৎসবের মধ্যে এমন ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দুর্গোৎসবের আনন্দঘন মুহূর্তে অর্চনা রানীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে নামাপাড়া গ্রামজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে। যাঁর কণ্ঠে আরতি, গানে আর নাচে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, সেই অর্চনা রানীর মৃত্যুর ঘটনায় মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় মন্দিরের পরিবেশ।